Feeds:
পোস্ট
মন্তব্য

ঘাই

শেখেরটেক হাট থেকে আকাবাকা হয়ে পুব দিকে যে রাস্তাটা চলে গ্যাছে, পদ্দাপদ্দি নদীর ধার ঘেষে, ওটা ধরে মাইল চারেক সামনে গেলে যে গ্রামটা চোখে পড়ে তার নাম তালুকদার বাড়ি। গ্রামটা চিনা খুব সহজ, কারন ইংরেজ আমলে শাহ তালুকদার জমিদার ছিলেন, সেই আমলের বিরাট আলিশান প্রাসাদের মত বাড়ি অত্র এলাকা তো বটেই, জেলাতে আছে কিনা এই নিয়ে দারুন সন্দিহান এলাকার মানুষ। আর একটা সহজ চিনার উপায় আছে তালুকদার বাড়ি। একটা বকুল গাছ। বিরাট গাছ, একদম ছাতার মত দেখতে, বৃষ্টির সময় গাছের নিচে দাড়ালে বেশ খানিকটা সময় ছাট থেকে বাচা যায়। পনের মাইল দক্ষিনে রায়বাজার, সেখান থেকেও পরিষ্কার চোখে পড়ে বকুল গাছটা। তালুকদার বাড়ি গ্রামের গর্ব এটা।

বাড়িটা বিশাল, উচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। মুল ফটক থেকে প্রাচীরের বাইরে ধার ঘেসে সোজা উত্তরে গেলে প্রথমেই পরে বিরাট সুপারি বাগান, সুপারি বাগানের ভিতর দিয়ে একটু বায়ের রাস্তা ধরে তিন মিনিট হাটলে পরে আম বাগান, প্রায় আশিটা গাছের বিরাট বাগান। আম বাগানের মাঝখানে প্রায় একশ বছরে পুরোনো পুকুর আছে একটা। নামেই পুকুর, মজে গেছে, কেউ যত্ন নেয়না, যদিও পানি থাকে ওখানে বারোমাস।

জমিদারি যদিও নেই, প্রতিপত্তি কমেনি তালুকদারদের। ষষ্ট পুরুষ আব্দুল মজিদ তালুকদার তিন বার চেয়ারম্যান ছিলেন, তার ছেলে বছর চল্লিশের হাফিজ তালুকদার বাবার ফেলে যাওয়া হাল ধরেছেন শক্ত হাতে। পঞ্চম পুরুষের রেকর্ডটাই একটু যা খারাপ ছিল, মুক্তিযুদ্ধের সময়, তবে গল্পের খাতিরে সেদিকে যাওয়াটা মনে হয় ঠিক হবে না।

পদ্দাপদ্দি নদীটা এখন মরা, আগে বজরা আসত, দেবী চৌধুরানীর বজরা এসেছিল বার দুই, তালুকদার বাড়ির প্রথম পুরুষ, শাহ পরি তালুকদারের সংগে ওনার বেশ ভাব ছিল শোনা যায়। সেই খাতিরে আসা। অবশ্য নন্দি পাড়ার নাপিত গুলো অন্য কথা বলে, ডাকাতি বা বখরা ভাগাভাগি এইসব আরকি। যাইহোক, পদ্দাপদ্দির সেই রুপ আর নাই, গ্রীষ্মে হাটু পানি, বর্ষায় যা একটু হয়, অনেকটা বিলের মত ছপ ছপানো, স্রোত নাই। কৃ্ষকরা ধান লাগায় নদীর ধারে, পানি বাড়ে, ধানের গাছও বাড়ে, আর কৃ্ষকরা কোচ আর কোশা নিয়ে রাতে-দিনে পড়ে থাকে নদীতে, মাছ ধরার জন্য।

নিঃসন্তান হাফিজ তালুকদারের নেশা বলতে অই একটা। কোচ দিয়ে মাছ ধরা। জমিদারী প্রথার সংগে একদম যায় না ব্যাপারটা। খুব বিরক্ত হতেন মজিদ তালুকদার, ছেলের এই বদ নেশায়। কিন্তু ছেলেকে ফেরানো যায়নি, বর্ষার পানি পদ্দাপদ্দিতে আসা মাত্র ছেলে উধাও, দিন নেই রাত নেই, নদীতে কোচ নিয়ে ঘুরাঘুরি। ছেলেকে ফিরানোর জন্য অনেক কিছু করেছেন, এমনি কি আশেপাশের দশ গ্রামের সবচেয়ে সুন্দর মেয়েকে বউ করে এনেছেন, কিন্তু ছেলের মতি ফেরেনি। শেষে উপায় না দেখে আক্কাসকে বেধে দিয়েছেন হাফিজের সঙ্গে, একটা পাচ ব্যাটারীর টর্চ আর বল্লম দিয়ে, বলা তো যায় না, শত্রুর অভাব নেই চারপাশে।

মজিদ তালুকদার গত হয়েছেন তা প্রায় বছর পাচ, কিন্তু আক্কাস নিয়মটা বদলায় নি, ছায়ার মত থাকেছে হাফিজের সাথে গত বিশ বছর, দিনে ছাতা আর রাতে বল্লম নিয়ে। বদলাও দিয়েছেন হাফিজ তালুকদার, অভাবের সংসারে পর পর তিনটা মেয়ে হয়েছে আক্কাসের, মাঝের মেয়ে, সালেহাকে নিয়ে এসেছেন নিজের কাছে, মেয়ের মত রাখবেন এই ইচ্ছায়। কৃ্তজ্ঞতায় বিক্রি হয়ে গেছে আক্কাসের মন, এই না হলে তালুকদার বংশ, এতবড় উদারতা তাদেরই মানায়, মনকে বুঝিয়েছে সে।

কোচ দিয়ে মাছ ধরার একটা নিয়ম আছে। কোশা নিয়ে খুব আস্তে আস্তে ঘুরতে হয়, যেন পানিও টের না পায়। ধানের ফাকে ফাকে ঘুরে বেড়ায় প্রমান সাইজের মাছ, মাঝে মাঝেই ঘাই মারে। একেক মাছের ঘাই একেক রকম। কোন কোন মাছ এক জায়গা সহজে বদলায় না, মানুষের মত, এইগুলা মারা খুব সহজ। একবার ঘাই দেখে বুঝতে পারলে খুব সাবধানে কোশা চালিয়ে নিতে হয় কাছাকাছি জায়গায়। এরপর চুপ করে অপেক্ষা, আবার আসবেই, ধৈর্য্য হারানো যাবে না, তাহলে পুরা খেলাই খতম, আবার ঘাই আসবেই। পাচ মিনিট, দশ মিনিট, আধা ঘন্টা, এই সময় টুকু একটা খেলা। এরপর ঘাই আসলেই সা-ঝাক করে ছুড়ে দিতে হবে কোচ, গেথে ফেলতে হবে খুব শক্ত করে, যাতে ছুটে না যায়। মাছটা এই সময় তড়পাবে অনেক, অইটা দেখতে খুব আরাম, আহ, শিকারে একটা মজা আছে না।

কোন কোন মাছ আবার এক জায়গায় ঘাই মারে না। একটা দিয়ে একটু জায়গা বদল করে, যাযাবর টাইপ, ওদের গতিবিধিও বুঝা যায় ঘাই এর ঢেউ দেখে, এরপর কোশা নিয়ে জায়গায় গিয়ে অপেক্ষা, আগের মতই, এরপর সা-ঝাক। আহ কি তৃপ্তি।

 

 আম বাগানের পুকুরটা দেখছ নাকি ঈদানীং আক্কাস, একদিন বাজার থেকে ফিরতে ফিরতে আক্কাসের কাছে জানতে চান হাফিজ তালুকদার। কোন একটা বড় মাছ আটকা পড়ছে মনে হয়।

জী হুজুর, একটা কাতলা, পাচ কেজির কম না। পাচ কেজি……। চোখ চকচক করে হাফিজ তালুকদারের, এইটা আসল ক্যামনে?

বানের পানির লগে ডুকছে মনে হয়, গত বছর

রুইয়ের চেয়ে কাতলা মাছে তেল বেশি থাকে, কাতলা মাছ যত বড় হবে, পেটে তেলের পরিমান তত বেশি, চাখতে তত বেশি মজা। আর পুকুরের মাছ যেহেতু, খুব কঠিন হবে না কাজটা।

 

রাতের বেলায় তার কি কি দরকার এইটা বিবি সাহেবের মুখস্ত, প্রথমে হাত মুখ ধোয়ার জন্য পানি সাবান টুল, এরপর একটু বিশ্রাম নিয়ে অজু-নামাজ, রাতে খাবার পর একটা কর্পুর দেয়া পান।

 

সালেহার বয়স কত হল? বেমক্কা এই প্রশ্নে হকচকিয়ে যান বিবি সাব। সামলে নেন দ্রুত।

কত আর, ষোল হয় নাই

ষোল বচ্ছরের মাইয়া, শাড়ি পড়াইছ ক্যান, সালোয়ার নাই, সালোয়ার পড়তে পারে না

মেয়ে বাপের সামনে আইতে পারব না?

তোমারে অত বেশি বুঝতে হইব না, ওরে শাড়ি পইড়া আমার সামনে আসতে নিষেধ করবা, প্যাট দেখা যায়, আমার এইগুলা পছন্দ না

 

অনেক দিন পরে ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজের আগে আগে গোছল করেন হাফিজ তালুকদার। ঘুম তো বটেই, নামাজের মাঝেও তার সামনে কাতলার পেটটা দুলতে থাকে।

 

নাহ মাছটা আজ কালকের মধ্যে গাথতে হবে। দেরী হলে অন্য কারও চোখে পড়ে যেতে পারে।

রেটিং, শেষ পর্ব

(১। কয়েকদিন দিন থেকেই মনটা অন্ধকার হয়ে আছে। ব্লগে আসি আর চলে যাই। কমেন্ট করতে মন চায় না। কিছু ভালো না, লক্ষন খুব খারাপ।

২। লেখাটা লিখেছিলাম সচলায়তনের জন্য। আমার ৪/৫ মাস ব্লগিং জীবনের শুরুটা সচলায়তন দিয়ে। সিসিবি এর দেখা পাবার পর সচল এর প্রয়োজন ফুরিয়েছে। তাই পোষ্টটা এখানে টেনে আনলাম। দেখি পোলাপাইনের কথা বার্তা শু্নে মুড ঠিক হয় কিনা)

 

খুব কাছের বন্ধু বলতে যা বুঝায় আমার সাথে জাফর এর সম্পর্ক সে রকম। মানসিকতার অদ্ভুত মিল, এক সংগে সুনীল, পূনের্ন্দু আবৃত্তি, তুই কখনো কনডেন্স মিল্কে চা খেয়েছিস, হু, বদ গন্ধ, বিখ্যাত লেখকের মুন্ডুপাত, এইসব হাবিজাবি। মধ্যরাতে ঘুরতে বেড়ানো, সোডিয়ামের মায়াবি আলোয় শহরের পোড়োবাড়ির জানালায় ঝুলে থাকা পাকুড়, ন্যাড়া গাছের ফাঁকে পুর্নিমার আলো, শহরের সবচেয়ে উঁচু দালানের ছাদে উঠে ব্যাস্ত রাস্তার মাতামাতি, অলস দুপুরে বিলের পানিতে ঢিল, ছুটিতে এইগুলো ছিল পছন্দের প্রথম দিকে। আমরা তিন দিনের ছোট বড়, মধ্যবিত্ত পরিবার, কাছাকাছি বাসা, ক্যাডেট কলেজ এর পরিবেশ, যেখানে বন্ধু মানেই অন্য কিছু, এইসব গাঢ় করেছিল সর্ম্পকটা।

 

জাফরের বাড়ির অন্দরে ছিল আমার অবাধ যাতায়াত। ওর বিছানায় সটান শুয়ে দুপুরের ঘুম, টেবিলে বসে খাবার বায়না এইগুলি ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার। খালার (জাফরের আম্মা) কাছে আমি ঘরের ছেলে, জুঁই (জাফরের বোন) এর কাছে ভাইয়ার বন্ধু এর বাধা অতিক্রম করে আর একটা ভাইয়া  

 

ছুটির দিন গুলো খুব মজা করতাম আমরা। ছোট শহর। দল বেধে ঘুরতাম। ক্যাডেটের বন্ধু, বাহিরের বন্ধু, বেশ বড়সর দল হত প্রায়ই। আমাদের একটা প্রিয় কাজ ছিল মেয়েদের রেটিং করা।

 

একটু খুলে বলি।

 

০ থেকে ১০ এর মধ্যে আমরা রেটিং করতাম। ৬ এর উপর কেউ নম্বর পেলে সে সুন্দর, মানে সুন্দরী আর কি। তারা চিকি গ্রুপ এর সম্মনিত সদস্যা। এর নীচে যাদের নম্বর তারা পয় গ্রুপ। চিকি শব্দ টা সম্ভবত চিকস এর অপভ্রংশ। কিংবা উল্টোটা। সুন্দর মেয়েরা সাধারনত চিকন চাকন হয়। চিকস হচ্ছে চিকন এর ইংরেজী ভার্সান। পয় এসেছে পয়মাল শব্দ থেকে। খুলি হাল, তুলি পাল, আগুয়ান, পয়মাল, পয়মাল। পয়মাল শব্দ টা কানে লাগে। অর্থ জানিনা। অর্থ জানে কবি আর বাংলার মাড্যাম। আমরা নিলাম পয় শব্দটা, অসুন্দরদের জন্য।

 

তো আর কি। সারাদিন ঘুরি আর রেটিং করি। রাস্তায়, মোড়ের দোকান, শপিং সেন্টার, স্কুলের সামনে। দলের কেউ চিকস দেখতে পেলে চিকার করে অন্যদের দেখাই, এই সৌন্দর্য্য থেকে যাতে কেউ বঞিত না হয়। আর দিনশেষে হিসাব করি, দিনের পারফরমান্স কেমন।

 

একদিন বিকালবেলা। আমি আর জাফর সাইকেলে চড়ে শহরের অলি গলি ঘুরছি। উদ্দেশ্যবিহীন অলস ঘোরা। যদি কোন মেয়ে চোখে পড়ে তো রেটিং করা। তেমন কাউকে চোখে পড়ছেনা। কয়দিন পরে আবার কলেজে ডুকতে হবে, কি কি জিনিস স্টাফ এর চোখ ফাকি দিয়ে কলেজে ডুকানো যায় তার একটা লিস্ট মনে মনে রেডি করছিলাম আর আলোচনা করছিলাম জাফর এর সংগে। এমন সময় দূরে একটা হুডখোলা রিক্সা দেখে আমরা নড়ে চড়ে উঠি। ছোট রাস্তার দুই পাশে দুই জন কাভার নেই যাতে রিক্সাটাকে অবশ্যই আমাদের মাঝখান দিয়ে যেতে হয়। ফ্রন্ট ভিউ, সাইড ভিউ দুটোই পাওয়া যাবে। রেটিং হবে নির্ভূল। সাইকেলের স্পিড কমে দিয়েছি একদম শুরুতে। আরোহীনি বসে আছে রিক্সাচালকের একদম পিছনে, মুখ দেখা যায় না। চুলটা চোখে পরে। বেশ কালো।

 

নিশ্চয় চিকস আমি আশা করি। জাফর চুপচাপ, মন্তব্য একটু ধীরে দিতে পছন্দ করে ও।

আরোহীনির হাতের ব্যাগটা চোখে পড়ে এরপর। ধুর, পুরান মডেল।

নির্ঘাত পয় হবে। ব্যাগটার কারনেই মত পালট্টাই।

খুব কাছে চলে এসেছে রিক্সা। একটু পরেই নজরে পরবে আতিকাঙিত মুখ। কেমন হবে মুখটা? আঙুল গুলোতো খুব সুন্দর।

না, এ চিকি। অনুমান বদলাই আবার। জাফর তখনো চুপচাপ।

 

রিক্সা আমাদের ক্রস করে চলে যায়।

 

আরোহীনিকে দেখে আমি চুপসে গেছি। ধরনী দ্বিধা হও, আমি তোমার গর্ভে মুখ লুকাই। আড়চোখে জাফর কে দেখি। যেকোন মূর্হুতে মাইর টাইর দিতে পারে। কিছু বাংলা গালি তো নির্ঘাত। আর জাফর যদি কিছু নাই বলে, আমি নিজেকে কি বলব।

 

দোস্ত, অইটা তো জুঁই। প্রায় ৩০ সেকেন্ড পর জাফর বলে।

 

সেই আমার শেষ রেটিং।  

 

 

 

 

 

 

ক্যাডেট বেলা

৮৭ থেকে ৯৩। অনেক আগের কথা তাই না। এখন আমরা তো সবাই ৩৫ ছুই ছুই। অনেক কিছুই ঝাপসা লাগে।

 

৮৭ তে যখন কলেজে ডুকি তখন Inter College  কোনো Program হতো না। কলেজ গুলো ছিল অনেকটাই বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মত। অন্য কলেজ গুলো সম্পর্কে জানতাম নতুন বদলি হয়ে আসা স্যারদের কাছে, আর, ছুটিতে, একই শহর কিন্তূ অন্য কলেজের বন্ধুদের কাছে। BTV এর একটা common platform ছিল, বির্তক প্রতিযোগিতার, ওখানে মাঝে মাঝে দুই ক্যাডেট কলেজের বির্তক প্রতিযোগিতা হতো। যমুনা নদীকে base ধরে কলেজ গুলোকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছিল। ক্লাস টুয়েলভ এর ছেলেরা একটা লম্বা Study Tour বের হত। আমরা যেতাম সুন্দরবন, মাঝে একরাত কাটাতাম ঝিনাইদহ ক্যাডেট এ। ওরা আমাদের একটা ডিনার খাওয়াত। এই ছিল Inter College  Relation

 

আমাদের নিজস্ব গন্ডীর যোগাযোগ । কলেজের ক্ষুদ্র পরিসর থেকে এক লাফে অনেক বড় একটা জায়গা। চিন্তার ধরনটাও একটু একটু করে বদলে যায়। কি করব থেকে, বিয়ে কবে করবি হয়ে এখন ছেলে মেয়েরা কোথায় পড়বে এই চিন্তা। আড্ডার টপিক বদলায়। কেউ সামরিক, কেউ সরকারি, কেউ বে-সরকার কেউবা পরবাসি। কেউ ভীষন আস্তিক হয়ে পড়ে, কেউবা ভীষন রকম নাস্তিক। আহমেদিয়া (কাদীয়ানি) গ্রুপে চলে যায় একজন। আড্ডার সুর পালটায় না। ওটা আবার কি?

 

Old is Gold    

 

কলেজের একটা প্রিয় জিনিস ছিল কুয়াশার দৌড়। মাঝরাতে মাঝে মাঝে দেখতাম, যখন খুব শীত পড়ত। বন্ধুদের দেখাতাম, ওরা হাসত, মারত। আহা এত মজার পিটুনি আমি কতদিন খাইনি। হাসানের মোজার গন্ধে টিকতে না পেরে বাগানে ফেলে দিয়েছিলাম বলে কি রাগ হাসানের আমার উপর। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কবিতা হাসান লিখবে বলেছিল, আমাকে নিয়ে, লেখেনি, আমি জানি ও লিখতে পারবেও না। চাপা।

 

৯৩ পেলাম প্রথম এবং একমাত্র Inter College  Sports meet.  ভলিবল টিমের সংগে গেলাম ঝিনাইদহ। গ্রপ পর্ব পেরিয়ে মির্জাপুর। একটা করে ম্যাচ জিতি আর আডজুটেন্টের এর ভুরি ধরে সেকি নাচ। তু তু তু তুতু তারা, বোলো না দিল হামারা…………।

 

আহা…।

আহারে কি আকাশ।

কি তাহার দীর্ঘশ্বাস।

একটি সাপ কাহিনী

হাইপোথিসিস নম্বর এক। শীত নিদ্রা দেবার আগে কিছু কথা লেখা দরকার, না হলে পাবলিক আমাকে ভুলে যেতে পারে।

হাইপোথিসিস নম্বর দুই।  পুজার পুরা তিন দিন ছুটি, কোনো কাম নাই।

মিল্ক ব্রেক এ টের পাওয়া গেল, সেকেন্ড হাই টেবিলের ইসলাম এর সিট টা খালি। তা খালি থাকতেই পারে। প্রিফেক্ট যেহেতু নিশ্চয়ই ব্যাস্ত আছে কোথাও। আগের ক্লাসটাতেও তো প্রেজেন্ট ছিল।

 

মিল্ক ব্রেকের পর ব্যাবহারিক ক্লাস, কে কই আছে কোন খবর নাই। ইসলাম এর খবর পাওয়া গেল লাঞ্চ এর আগে আগে।

-কি ব্যাপার দোস্ত তুই কই ছিলি?

-দোস্ত, আডজুট্যান্ট আমার পাছায় ব্যাতাইছে

-কিইইইইইই এত্ত বড় সাহস, প্রিফেক্ট এর পাছায় বাড়ি মারছে। তুই কি কছ এইগুলা?

-সত্যি, ইসলাম এর চোখ মুখ লাল।

ডাক মিটিং ডাক, ওই লাঞ্চ এর পর মিটিং, সবাই মঞ্জুর এর রুমে চলে আয়।

-ওকে।

আমারা উত্তেজনায় কাপি, এইবার কিছু একটা করতে হবে হবেই। ছাড়াছাড়ি নাই, প্রিফেক্ট এর পাছায় বাড়ি, মান ইজ্জত কিছু বাকি নাই আর।

 

এই ফাকে বলি, আডজুট্যান্ট লোকটা খুব একটা জুতের ছিল না আমাদের জন্য। সে নিজেও এক্স ক্যাডেট, মির্জাপুর, বদের হাড্ডি ছিল শুনছিলাম তার ক্যাডেট বেলায়। এয়ারফোর্সে খুব ভাল রেকর্ড, কিন্তূ পরে আর ফ্লাই করতে পারত না, নাক দিয়ে রক্ত পড়ত। এই চিজকে রংপুর ক্যাডেটে আমদানী করেছেন লে কর্নেল এমদাদ। অসম্ভব ডিসিপ্লিইন্ড একজন অফিসার। লে কর্নেল এমদাদকে আবার স্পেসাল এসাইনম্যান্ট দেওয়া হয়েছে ক্যাডেট কলেজ মনিটরিং বোর্ড থেকে, রংপুর ক্যাডেট এর বাদরামির পরিমান একটা সহনীয় মার্তায় আনার জন্য। এইগুলো ঘটে আমরা যখন টেন এর শেষদিকে। বদের হাড্ডি একটা ব্যাচ এডু স্যার বেছে নিলেন, যাদের ধোলাই দিয়ে পুরো কলেজ কে ঠান্ডা করবেন। সুন্দর একটা নাম দিলেন সিস্টেমটার। Example batch আর Example punishment. পুরা ব্যাচ কে শাস্তি দেয়া বড় ঝামেলার। তাই উনি শর্ট-কাট রাস্তা বের করলেন একটা। Example batch থেকে বেছে বেছে কিছু ক্যাডেট বের করলেন। এরা হল Example ক্যাডেট। এর পরের হিসাব তার জন্য খুব সহজ। উলটা পালটা যাই হোক আগে ধরে ধোলাই দাও অই ব্যাচের অই ক্যাডেট গুলারে। দুনিয়া কেমনে ঠান্ডা হয় দেখ। পাক্কা তিন বছর এই চিজ আমাদের পিছনে লেগেছিল। আমাদের পাসিং হবার পর উনি চাকুরি থেকে অবসর নিয়েছিলেন। ………একেই না বলে প্রেম।

 

সিস্টেমে কাজ হলো। আমরা কিছু করার আগে চোদ্দ বার ভাবি, এমন ভাবে প্ল্যান করি যেন মাহমুদ, মনোয়ার (Example ক্যাডেট) প্রমান করতে পারে তারা অই সময় অন্য কাজে ছিল। স্পটে ছিল না। এহেন চিজ কে সাইজ করার ব্যবস্হা করে দিল এই ক্যাডেট ইসলামের পাছায় বাড়ির ঘটনা। এই সুযোগ কাজে লাগানো দরকার।

 

মঞ্জুরের রুমে ইসলাম পয়লা একটা জ্বালাময়ী বক্তব্য দিল ইসলাম। শেষটা মনে আছে

এতদিন আমরা বলছি, তোরা যা আমি তোদের সংগে আছি। কিন্তু এইবার আমরা বলব আমি যাচ্ছি, তোরা সংগে আয়।

ফাটায় হাততালি দিলাম আমরা।

ডিসিসান হল, আমরা প্রিফেক্টরা সর্বাত্তক অসহোযোগ আন্দোলনে যাব। কোথাও লিড দিব না। যা করার জুনিয়র প্রিফেক্টরা করবে। ডিসিসান এইরকম নেবার কারন, এডূ স্যার মাহমুদ, মনোয়ার, মাসরুরকে আর ধরতে পারবে না। আরও ডিসিসান হল, প্রিফেক্ট যারা কলেজ ভলিবল আর বাস্কেটবল টিমে আছে তারা প্র্যাকটিসে যাবে না। স্পোর্টস মিট এর খ্যাতা পুড়ি।

 

তখন গরম, গেমসের আগে একটা প্রেপ আছে। অবশ্য কলেজ ভলিবল আর বাস্কেটবল টিম এই প্রেপে যায় না, তারা অইসময় থেকে প্র্যাকটিস শুরু করে। সবাই প্রেপে যায় আর আমরা যাই খেলতে, অন্যরকম একটা ভাবে থাকি তখন।

যেই কথা সেই কাজ, প্র্যাকটিস ড্রেস না পরে আমরা প্রিফেক্ট কাম প্লেয়াররা গেমস ড্রেস পরে প্রেপে গেলাম। এর মাঝে আমি কলেজ গেমস প্রিফেক্ট, ভলিবল টিম এর ক্যাপ্টেন, আর শামস ওমর ফারুক হাউসের হাউস প্রিফেক্ট, বাস্কেটবল টিমের ক্যাপ্টেন। গেমস প্রিফেক্ট হিসেবে গেমস প্যারেড আমার কমান্ড করার কথা। ঘটনা তার আগেই ঘটবে তাই অইটা নিয়ে মাথা ঘামানোর কোন দরকার নেই।

 

ঘটনা যে প্যাচ খাচ্ছে বুঝতে পারছিলাম প্রেপ টাইম থেকেই। ডিউটি স্যার যেই দেখেন প্র্যাকটিস বাদ দিয়ে ক্লাসে বসে আছি, একটা খোটা দেন। ষ্টাফ ক্লাসে এসে দেখে গেল, পড়াশুনা করি, খবর আছে বলল, এডু স্যার বিপ্লব এর খবর পেয়ে গেছেন। টিমের কোচ দ্বয় একসংগে এডজুট্যান্ট এর কাছে রিপোর্ট করেছেন, টিম ক্যাপ্টেন সহ কিছু প্লেয়ার প্র্যাকটিসে নাই। প্রিন্সিপাল স্যার (লে কর্নেল ওবায়েদ) জানতে চেয়েছেন ঘটনা কি। খেলা তো জমে গেছে মামু।

 

শামস আর আমি একসংগে প্যারেড গ্রাউন্ডের দিকে যাই প্রেপ এর পর, কান খাড়া, কখন ডাক আসে। বেশিক্ষন লাগে না।

-ইউ ব্লাডি ক্যাডেটস, শামস, ফয়েজ কাম অন হেয়ার, হ্যারি আপ।

-ব্লাডি আই সে ডাবল আপ

-উই ব্লাডি শিট, ব্লাডি প্রিফেক্ট, হ্যান্ডস ডাউন

- আই টোল্ড, হ্যান্ডস ডাউন

পুরা গ্রাউন্ড চুপ। পুরা কলেজ, স্যারেরা, প্রিন্সিপাল।

সবার সামনে হ্যান্ডস ডাউন হই।

-ষ্টাফ ক্যারি অন দ্য প্যারেড। এডু হুকুম দেয়।

 

ষ্টাফ প্যারেড হ্যান্ড ওভার করে, অম্প সময় পড়ে ডিসমিসও করে দেয় গেমসের জন্য। এরপর শুরু হয় আমাদের পাংগা। কিছুক্ষনের মধ্যেই এডু বুঝতে পারে আরো প্রিফেক্ট আছে যারা আসতে পারে এই তালিকায়, মানে যারা প্রিফেক্ট এবং কলেজ টিমে আছে। মানে পাংগা খাবার উপযুক্ত। ডাকো রকিবকে, ডাকো ফিরোজকে, ডন, তারিক, ডাকো ডাকো।

৩০/৪০ মিনিট সাইজ হই। মহান কর্ম এডু একা ডিল করে। আমাদের ব্যাচকে শাস্তি দেবার জন্য কখনই স্টাফ নিতে চাইতেন না উনি। ব্যাচের একটা র্মযাদা ছিল। পাংগার পরে শুরু হয় ঝাড়ি। প্রথমে ইংরেজী, তারপর বাংলিশ হয়ে বাংলায় চলে আসে ঝাড়িগুলো।

গেমস শেষ হয়, বিউগল বাজে, ক্যাডেটরা হাউসে চলে যায়, টি-ব্রেক এর টাইম হয়, চোখের সামনে দিয়ে ক্যাডেটরা টি-ব্রেক এ যায়, এডু স্যার এর ঝাড়ি শেষ হয় না। এডুর ঝাড়ির মুল বক্তব্য, প্রিফেক্টদের জন্য তিনি কলেজটাকে জুতের করতে পারেন নাই। আমরা বড় নন-কোওঅপারেটিভ।

স্যার, আমরা নন-কোওঅপারেটিভ না, আপনারা নন-কোওঅপারেটিভ, একজন প্রিফেক্টকে যতটুকু সাপোর্ট দেয়া দরকার কলেজকে সাইজে রাখার জন্য আপনারা তা দিতে পারেন না বা দেন না।রকিব বলে অনেকক্ষন পর।

-ডু ইউ হাভ এনি এভিডেনন্স?

-ইয়া আই হাভ

-ওকে, টেল মি।

-নো আই উইল নট টেল ইউ, আনলেস ইউ গিভ গ্যারান্টি, ইউ অনন্ট টেল আনিবডি

- বি শিওর অন ইট, আই উইল নট টেল আনিবডি

এরপর শুরু হল রকিব, ফিরোজ, শামস আর আমার স্যারদের নামে কমপ্লেইন আর কমপ্লেইন। কোন স্যার ডিউটিতে থাকার সময় হাউসে আর ডাইনিং হলে পোলাপাইন কে সাইজ করার সময় কি কি ভাবে আমাদের বিরক্ত করেছে, আর এরজন্য কলেজের সুনাম কি কি ভাবে ব্যাহত হয়েছে তার ফিরিস্তি। এর কিছু কিছু অবশ্য একদম জেনুইন।

ফিরিস্তি শুনে এডু কিছুক্ষন ঝিম মেরে থাকে। তারপর ছেড়ে দেয়।

-গো আন্ড এটেন্ড মাগরিব প্রেয়ার।

আমরা হাফ ছাড়ি। ফাড়া মনে হয় কাটলো।

 

ডিনার করে নাইট প্রেপ এর জন্য একাডেমি যাচ্ছি দেখি হাউস মাষ্টার রুমের সামনে এডু দাড়ায় আছে। উহু, ফাড়া কাটে নাই।

 

-ইউ ফয়েজ, কাম অন, কাম অন, আস্ক ইউর ফ্রেন্ড টু কাম

- হু?

- ইউর গেমস ফ্রেন্ড, হুম হ্যাভ ডিসকাসড লাষ্ট নুন

-ওকে

আবার শুরু হল শান্টিং। এইবার অপরাধ, আমাদের ম্যাক্সিমাম কমপ্লেইন সঠিক নয়। তদন্তে এইটা প্রমানিত হয়েছে। অতএব শাস্তি অবধারিত।

আমরা এডু স্যারকে বুঝাই। আচ্ছা, ম্যাক্সিমাম কমপ্লেইন সঠিক নয়, কিন্তু কিছু তো সঠিক, তাই বা কেন হবে?……….স্যার কে একটু কনফিউজ মনে হয়। আরো কনফিউজ করে দেবার আপ্রান চেষ্টা করি আমরা। জয়  আমাদের সুনিশ্চিত। পরিবেশ অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসে।

 

এর মধ্যো নাইট প্রেপ শেষ, ফ্রি আওয়ার শেষ, লাইটস অফের বাশি পরে যায়।

 

লাইটস অফের বাশি পরপরই সিনিয়র ব্লক থেকে শুরু হয়ে যায় হো—-যা—মাল—-হো। আমরা জনা সাতেক ছাড়া, সব ব্যাচ মেট এডু স্যারের গুষ্টি উদ্ধার করে হো—-যা—মাল—-হো দেওয়া শুরু করছে।(এইখানে বলি হো—-যা—-মাল—-হো একটা গালি বিশেষ, যিনি একবার খেয়েছেন এবং বুঝতে পেরেছেন এইটা গালি, তিনি আর এইটা খাইতে চাইতেন না)।

-ব্যাপারকি ব্যাপারকি, তোমাদের ব্যাচমেটরা চিল্লায় ক্যান? এডু স্যার জানতে চান।

-স্যার অনেকক্ষন ধরে আটকায় রাখছেন তো, নিশ্চয় অনেক পানিসম্যান্ট দিয়েছেন, এইটা ভাবছে ওরা

-এইজন্য শিয়ালের মত হুক্কা হুয়া করবে নাকি সবাই। এডু স্যার আবার পুরানা ফর্মে ফিরে যান। রণ মুড।

-ফয়েজ, আস্ক ইউর ফ্রেন্ড ফর ফলিন, ওয়িদিন টেন মিনিটস, আন্ড ইউ কাম ওয়িথ পিটি ড্রেস

 

আমি একদৌড়ে তিতুমীরে গিয়ে রেজাকে আর ওমর ফারুকে গিয়ে কামালকে বলি সবাইকে রাস্তায় ফলিন করতে। এরপর নিজে পিটি ড্রেস পরে রাস্তায় নামি। রাত তখন প্রায় ১২ টা।

 

সবাইকে ফলিন করার পর আমরা যারা এডু স্যারের সামনে ছিলাম তাদের আলাদা করেন উনি। এরপর চেরী গাছের ডাল ভেঙ্গে বেত বানান কয়েকটা।

-মাহমুদ। চিতকার করেন উঠেন, চিতকার মানে চিতকার, ভয়াবহ অবস্হা।

-ইয়েস স্যার

স্যার একদৌড়ে মাহমুদ এর কাছে যান। এরপর হাটুর নিচে একের পর এক বেতের বাড়ি।

-স্যার আমি কিছু করি নাই তো, ঘুমায় ছিলাম

স্যার কোনো কথা শুনেন না। মনের সুখে পিটান মাহমুদ রে কিছুক্ষন। এরপর ধাক্কা দিয়ে বের করে আনেন বাইরে।

-ঊমেদ আলি উমেদ আলি হাউস বেয়াড়া উমেদ ভাইকে ডাকেন।

-জ্বী স্যার। মিন মিন করে উমেদ ভাই, এই ব্যাটাও ভয়ে আধমরা।

_ দেখতো হাউস মাষ্টারের রুমে ভাল বেত আছে কিনা?

-আছে স্যার। একদৌড়ে উমেদ ভাই বেত এনে দেয় তিনচারটা।

_যাও প্রতি হাঊসে গিয়ে বারান্দার লাইট গুলো জ্বালাও।

বারান্দার লাইট জ্বালানোর কারন আর কিছুই না, যাতে জুনিয়ররা সিনিয়রদের ধোলাই দেখতে না পারে।

_মনোয়ার

-স্যার আমি কিছু করি নাই, কিসের কি, মনোয়ারের পায়ে বাড়ি তিন চারটা মারা শেষ ওর পুরা কথা শেষ করার আগেই। ওকেও ধাক্কা দিয়ে বের করে দেন স্যার, নিয়ে আসেন মাহমুদ এর পাশে।

-মাসরুর

মাসরুর কোন কথা না বলে একদৌড়ে এসে দাঁড়ায় মনোয়ার, মাহমুদ এর পাশে। ওর দৌড়ের ভংগি দেখে এত দুঃখেও ফিক করে হেসে ফেলি কয়েকজন, মাসরুরে ট্রিক্স অবশ্য মার থেকে বাচাতে পারে না নিজেকে।

এরপর একই স্টাইলে আলাদা করা হয় আরো কয়েকজনকে। বাকিদের কান ধরে দাড়া করানো হয় হাউসের দিকে মুখ করে।

এরপর শুরু হয় চড়া গলায় গালি। গালি দিতে দিতে হয়ত স্যারের কারো কথা মনে হয়। চিতকার করে তার নাম ধরে ডাকেন আর প্রথমেই পায়ে সপাসপ দশ বারোটা বাড়ি দেন।

লুতফর ছিল ফলিন এর একবারে মাঝামাঝি। আবছা মত কয়েকবার যেন মনে হল সে স্যার কে কিছু একটা বলতে চাচ্ছে। মিন মিন স্বরে কয়েকবার স্যার স্যারও করেছে। কিন্ত পাত্তা পায়নি। লুতফরের পাশে যে দাঁড়িয়ে ছিল সেই পাত্তা দেয়নি টয়লেট ইস্যু মনে করে, আর স্যার তো অনেকদুরের কথা।

স্যারের তখন গরম গরম তর্ক হচ্ছে রেজার সংগে, রেজা প্রচন্ড নীতিবান একটা ছেলে, ষ্ট্যান্ড ছিল এস, এস, সি তে, তিতুমীরের হাউস প্রিফেক্ট, সবাই মোটামুটি সম্মান করে ওকে।

-স্যার স্যার লুতফুরের আওয়াজ একটু উপরে উঠে, পাশের জন্য ওকে একটা ধমকও দেয়, এইটা একটু জোরে হওয়ার কারনে আমরা অনেকেই ধরতে পারি, লুতফুর কিছু একটা বলতে চায়।

-স্যার স্যার শেষেরবার অনেক জোরোই স্যারকে ডাকে ও।

- তিন লাফে স্যার ওর কাছে যায়, ভাবে কিছু ইনফরমেশন পাবে হয়ত।

- স্যার, লুতফুর ডান হাতে একবার কান ধরে, একবার ছাড়ে, আবার ধরে, স্যার তোতলানো শুরু করে এইবার।

-আরে বাবা সমস্যা বলো না

_স্যার, সাপ স্যার সাপ, সাপ আংগুল তুলে দেখায় ও। তারপর আবার কান ধরে।

-এ্যা, কি বল,? স্যার দৌড়ে আইল্যান্ডের উপর উঠে যায়, অইটাই সবথেকে সেফ জায়গা ধারে কাছে।

-সাপ, কই, কই সাপ!!!! স্যার জানতে চান।

মুহূর্তের মধ্যো আমরা আইল্যান্ডে উঠার জন্য ঠেলাঠেলি শুরু করি। এদিক ওদিক দৌড় দেই কয়েকজন। এডু স্যারকে ঠেলাও মেরে বসে কেউ কেউ। গুরুগম্ভীর পরিবেশটা নিমিশেই একটা ভীতসনস্ত্র পরিবেশে পরিনত হয়। সবাই মিলে সাপ খুজি।

-কই সাপ কই, সবাই নিজেদের পায়ের কাছে সাপ খুজি।

_স্যার ওই যে, জাহাংগীর হাউসের ইন্টারমিডিয়েট ব্লকের লাইটের নীচে যে রুমটা আছে ওইটার জানালা দিয়ে প্যাচায় প্যাচায় আছে। মনে হয় রুমে ডুকবে। লুতফর স্পেসিফিক করে সাপের পজিসন। পজিসন মত আমরা তাকাই এবং আরে কি আশ্চর্য সাপই তো।

 

-সাপ, সাপ সাপ, আমরা চিতকার শুরু করি।

 

-উমেদ আলি উমেদ আলি, তুমি দেখো না, ক্যাডেট এর রুমে সাপ ডুকছে, যাও লাঠি নিয়ে যাও, সাপ টা মারো। আইল্যান্ডের উপর থেকে হুকুম দেন স্যার।

উমেদ ভাই ইয়া বড় ১২ ফিট লাঠি নিয়ে সাপ টাকে খূচিয়ে বের করার চেষ্টা করে।

_এই উমেদ, বেকুব, কি কর? সাপ টাকে মারো? স্যার ভয় পাচ্ছেন বুঝা যায়, নিজের জন্য নয়, রুমের ক্যাডেট গুলোর জন্য, রাত প্রায় দুইটা, রুমের ক্যাডেট তখন গভীর ঘুমে।

-স্যার এইটা ক্যাডেট সাপ, উমেদ ভাই এই সাপ মারতে পারবে না, ক্যাডেট লাগবে। স্যার কে বুঝানোর চেষ্টা করে অতি সাহসী মাসরূর।

-ওহহ স্যার এইটা দারাস সাপ, বিষ নাই। উমেদ ভাই নতুন তথ্য পাচার করে। দারাস সাপ দেখে উনার সাহসও টু দ্য পাওয়ার ইনফিনিটি হয়ে গেছে। দুই মিনিটের মাথায় মারা যায় সাপটা।

 

-ওকে বয়েজ গেট ফলিন। এডু হুকুম দেয়। আগের সুরটা আর নেই। উনিও বুঝতে পারে আর জুত হবে না। পাচ মিনিটের মধ্যো ছুটি পাই আমরা।

 

ফলাফল……… দিনের শুরুতে যা ছিল তাই।

 

প্রিফেক্ট এর হিপে বাড়ি খাওয়া নিয়ে যে আন্দোলনের সুত্রপাত, একটি নিরীহ দারাস সাপের মৃত্যু দিয়ে তার সমাপ্তি।  

 

 

 

 

ডিনার টেবিলে বড় ভাবী বললেন এমদাদ ভাই তো পাশের ফ্ল্যাটে থাকে, তোমার সংগে দেখা হয়নি

তাই নাকি। একটু অবাকই হই আমি। অসুস্থ হয়ে সেই যে কলেজ ছাড়লেন তারপর থেকে কিছুই জানি না। এখন কি পুরা সুস্থ?

কই আর, লাঠি নিয়ে চলাফেরা করেন। দেখতে যাবা

নিশ্চয়ই যাব। অ্যাড্রেসটা দেন। আমি বড় ভাবি কে আস্বস্ত করি।

৯৩ এর শেষ অথবা ৯৪ এর শুরুর দিকের কথা। বড়ভাই এর বাসা, ঢাকা ক্যান্ট এর শহীদ মাঈনুল রোডে আস্তানা গেড়েছি মাস তিন। উদ্দেশ্য ভালো কোন জায়গায় ভর্তি হওয়া। আমার তখন মাথার ঘায়ে কুত্তা পাগল অবস্হা। ভীষন মানসিক অস্হিরতা মধ্যো দিয়ে যাচ্ছি। অনেক গুলো কারন, ইন্টার-এর রেজাল্ট ভালো হয়নি। মার্কস এত কম যে বুয়েটে এ পরিক্ষা দিতে পারবনা। আমার জাদরেল টাইপ আব্বার সাফ কথা, আর্মিতে যেতে হবে; আমি বলেছি, অসম্ভব, আমি পারব না। বাসা থেকে অলমোষ্ট বের হয়ে এসেছিলাম। ISSB তে পরিক্ষা দিতেই হবে, দিয়েছি এয়ারফোর্স এর ফর্ম নিয়ে। এয়ারফোর্স এর ফর্ম নিয়েছি শুনেই আব্বা বুঝেছিলেন, ছেলে কথা শুনছেনা। রেজাল্ট এ যখন সাদা কাগজ পেলাম, বাসার দরজা প্রায় বন্ধই করে দেন আমার জন্য। আমি নাছোড়বান্দার মত বাসায় হাজির হয়েছি দেখে উনি নিজেই ঢাকা চলে এসে বোনের বাসায় একমাস থেকে গেছেন। কারন, আমি যদি রংপুর এ থাকি, উনি রংপুর এ থাকবেন না। আমার চেহারা দেখবেন না, যদি আমি আর্মিতে চান্স না পাই। মেধা যাচাই এর জন্য কারমাইকেলে পরিক্ষা দিয়েছি এবং চান্স পাইনি। আড্ডার অসুবিধা হবে জন্য বায়োলজি নেইনি এইচ, এস, সি তে, বিঙ্গান ২য় পত্রে লেটার পাবার পরও। বায়োলজি নেই তাই অই রিলেটেড সব সাবজেক্ট এর রাস্তা আমার জন্য বন্ধ। দেশের বাইরে যাব, তাও না, কারন এক্স-ফৌজিয়ান আমার এক ভাই রাজশাহী থেকে মাত্র ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে আমেরিকা গেছেন, মধ্যবিত্ত ফ্যামিলি থেকে এইমুহুর্ত্তে আর একজন অসম্ভব। সানরাইজ এর মডেল টেষ্টে ফিজিক্সে ১৭, আর ক্যামিস্ট্রিতে ৩৭ আমার রেকর্ড মার্ক। অংক পরিক্ষার প্রন্শ হাতে পেয়ে রুম থেকে বের হয়ে এসেছি। ঢাকা ইউনিভার্সিটি আমার জন্য নয় কারন আমার ক্যাডার হয়ে যাবার সমুহ স্মভাবনা। আমি কি চাই বুঝতে পারছিনা। আর তাই সেটার জন্য নিজেকে যোগ্য করে তোলার মত মানসিক অবস্হা আমার নেই। আমি মোটামুটি উদভ্রান্তের মত চলি।

 

লে, কর্নেল এমদাদউদ্দিন আহমেদ এর সংগে আমার দেখা করার কোন ইচ্ছাই সেই মুহুর্তে নেই।

 

ক্যাডেটে ভর্তি হয়েছিলাম যখন, তখন প্রিন্সিপাল ছিলেন, লে, কর্ণেল শারফুল। আমার দেখা সবচেয়ে অভিজাত আফিসারদের মধ্যো একজন। ডিসেন্ট এন্ড সোবার। ক্যাডেটদের বেশি ঘাটাতেন না, যতখানি মনে পড়ে। প্রিন্সপাল প্যারেড র্টামে হত একটা কি দুইটা। প্রায়ই প্রিন্সিপাল ইন্সপেকশনে প্রিন্সিপাল স্যার বাদ পড়তেন। ক্যাডেট কোন দুষ্টামি করতে পারে এটা মনে হয় উনি বিশ্বাস করতেন না। ছবি দেখতাম প্রায়ই। ভিসিপি ছবি না, রীতিমত বড় পর্দায় ছবি। বাংলা, ইংলিশ হিন্দি, কি নেই। কিন্তু ক্যাডেট বলে কথা, বাদরের আধুনিক সংস্করন, সুখ সহ্য হলো না সিনিয়রদের, কলেজের ডিসিপ্লিন পড়ে গেল একদম তলানিতে। কি একটা সমস্যা হল উনার এডজুট্যান্ট এর সংগে, এডজুট্যান্ট চলে গেলেন। নতুন এডজুন্ট্যাট আসল না অনেকদিন। সিনিয়রদের পুরা বগলি বাজানোর মত অবস্থা। ক্লাস টেনের একদম শুরুর দিকে (যতখানি মনে পড়ে) শুনলাম, শারফুল স্যার চলে যাচ্ছেন। নতুন প্রিন্সিপাল আসছেন ঝিনাইদহ থেকে।

তো তিনি আসলেন। প্রথম প্রিন্সিপাল এ্যাসেম্বিতে উনি যা বললেন তার সারমর্ম হল, উনি এসেছেন কলেজের ডিসিপ্লিন ঠিক করতে। আর এ ব্যাপারে উনার মটো খুব সিম্পল।ইফ ওয়ান ব্রাঞ্চ ইজ পলুটেড, কাট দ্য ব্রাঞ্চ টু সেভ দ্য হোল ট্রি। কথা বলতে বলতে উনি হাত তুলে দেখালেন, আমরা দেখলাম উনার হাতের একটা আংগুল এর অর্ধেকটা নেই, কাটা। সমঝদারকো লিয়ে ইশারাই কাফি

 

নতুন প্রিন্সপাল যে একজন এসেছেন আমরা বুঝা শুরু করলাম। প্রতি শনিবার প্রিন্সপাল ড্রিল, এক সপ্তাহ পর পর হাউস ইন্সপেকশন মিস হয় না। সকালে পি,টি টাইম থেকে শুরু করে রাতের নাইট প্রেপ, ক্যাডেটরা যেখানে প্রিন্সপাল স্যার সেখানে। মাগরিবের নামাজে ঈমাম সাহেবের পিছনে জুনিয়ররা বসত, প্রথমে ক্লাস সেভেন, এইট এইভাবে। নতুন স্যার নিয়ম চেঞ্জ করে দিলেন, ঈমাম সাহেবের পিছনে ক্লাস টুয়েল্ভ বসবে, এরপর ইলেভেন এইভাবে। ক্লাস সেভেন সবার পিছনে আর শেষ কাতারে প্রিফেক্ট আর ডিউটি মাষ্টার। ক্লাস টাইমে স্যার একবার টহলে আসেন, ডিনারের আগে পরে দুই প্রেপে দুইবার। ডাইনিং এ খাবার কেমন খোজ নেন ডাইনিং এ গিয়ে খাবার খেয়ে। গেমস টাইমে ক্যাডেট এর সংগে বাস্কেটবল খেলেন। ১৫ মিনিট খেলার পর মাঠে মাঠে ঘুরেন, খেলা বাদ দিয়ে কারা বসে আছে খোজা খুজি করেন। প্রিন্সপাল স্যারের জন্য বরাদ্দ করা গাড়ি ব্যাবহার না করে বাই-সাইকেল ব্যাবহার করা শুরু করলেন। খুব সহজেই চিপা চাপায় হাজির হতে পারতেন এই কারনে। হাতে নাতে বমাল কিছু ক্যাডেট ধরে ফেললেন। ডাব চুরির শাস্তি হিসাবে পাংগা দেবার পর সংশিষ্ট ক্যাডেট কে দশ বারোটা ডাব খেতে হল। প্রিন্সিপাল স্যার ডাইনিং এ এসে ঘোষনা দিলেন, ক্যাডেট এর ডাব ক্যাডেটরাই খাবে, খেতে চাইলে অথরিটিকে জানালেই হবে, কষ্ট করে চুরি করার কোন দরকার নেই।

 

আমাদের জীবনটা মোটামুটি তেজ পাতা বানিয়ে দিলেন তিন মাসে।

 

আরও অনেক কাজ করলেন। আমরা পি,টি টাইমে কলেজের বাইরে দৌড়াতাম, নিয়ম চেঞ্জ করলেন, ভিতরে দৌড়ানোর ব্যাবস্থা করলেন। আথলেটিক্স গ্রাউন্ডটা শীতকাল ছাড়া ফাকা পড়ে থাকত, বড় বড় শনে ভরে যেত। শন কেটে ফেলা হল, পরিনত হল সকালের পিটি গ্রাউন্ড আর নতুন একটা ফুটবল কাম হকি গ্রাউন্ডে। প্রতি হাউসে টিভি রুম হল। নতুন জ়েনারেটর আসল, নতুন মসজিদ হল। অবস্ট্যাকল গ্রাউন্ড হল। স্মৃতি থেকে বলছি, একটু এদিক উদিক হতে পারে।

 

কলেজে আমদানী করলেন স্কোয়াড্রন লীডার আহমেদ চৌধুরিকে এডজুট্যান্ট হিসেবে। আমদের সাইজ করে বাক্স বন্দি করার জন্য।

 

এই যখন অবস্থা হঠাত একদিন গেমস টাইমে প্রিন্সপাল স্যার অসুস্থ হয়ে পড়লেন । সি, এম, এইচে নিয়ে যাওয়া হল দ্রুত। ডিনারের সময় শুনলাম অবস্থা ভালো না, হেলিকপ্টারে করে ঢাকা সি, এম, এইচে নিয়ে যেতে হয়েছে। দুইদিন পরে শুনি একটু ভাল, অতিরিক্ত কাজের চাপে এই অবস্থা। ঠিক হয়ে যাবে। একদিন দুইদিন যায়, ইম্প্রুভ করছেন শুনি। আজ আসবেন কাল আসবেন এইসব। কিন্তু স্যার আর আসেন না। কলেজের পুরা পরিস্থিতি সামলানো শুরু করলেন এডজুট্যান্ট আর ভি,পি স্যার। ভি,পি স্যার অ্যাকটিং প্রিন্সিপাল এর দায়িত্ব পেলেন। 

 

ব্যাপারটা নিয়ে পরে আর তেমন মাথা ঘামালাম না, সামনে এস, এস, সি পরীক্ষা। এমদাদ স্যার সেই যে গেলেন তো গেলেন। রেজাল্ট এর পর কলেজে গিয়ে দেখি নতুন প্রিন্সিপাল স্যার। এই মোটামুটি ঘটনা।

 

বেশ কদিন পরে, একদিন সন্ধ্যায়, মাঈনুল রোডের বাসায় আসছি, স্যারের সামনে পরে গেলাম। একদম মুখোমুখি। স্যার হাটতে বেরিয়েছেন, আর আমি, পড়বি তো পর মালির ঘাড়ে।

 

এই ফয়েজ, ইয়াংম্যান, কেমন আছ? গলার স্বর আগের মতই, গম গম করে।

আছি স্যার, মোটামুটি। এরপর টুকটাক গল্প শুরু হয়। কলেজের কি অবস্হা, কে কি করছে, আগের ব্যাচের কার কার খবর জানি স্যার নাম ধরে ধরে জানতে চান। স্যারে স্মৃতি শক্তি আমাকে অবাক করে। এরপর নিদির্ষ্ট এক ক্যাডেটের কথা জানতে চান, তাকে কেন কলেজ থেকে উথিড্র করা হল জানতে চান।

আমি কারন বলি। স্যার কারন শুনে অবাক হন, মনে হয় এটা উনি আশা করেননি। বলেও বসেন আমার ক্যাডেট এইগুলা করবে? কথা বলতে বলতে উনার বাসার সামনে আসি। ভিতরে আমন্ত্রন জানান, চা খাবার জন্য।

 

এই কথা সেই কথা হবার পর তিনি একটা এলবাম নিয়ে আসেন। সেই এলবামে আমাদের সবার পাসপোর্ট ছবি, নিচে ক্যাডেট নাম্বার লেখা। আমার ছবিটা দেখান। আমি হতম্ভব হয়ে যাই।

আমাদের সবার ছবি আপনি রেখে দিয়েছেন? আমি অবাক, আমার বিশ্বাস হয় না। নিজের চোখে একটা কঠিন হৃদয়ের ভিতরের ছবি দেখি আমি। স্যার এর চোখের দিকে তাকিয়ে কোন তল খুজে পাইনা। লজ্জায় চোখ সরিয়ে নেই।

শুধু ছবি, ম্যাডাম কথা বলেন, তোমার স্যার সকাল বিকাল ছবি গুলা দ্যাখে আর মুছামুছি করে

 

একটা অপরাধবোধে আমার মনটা বিষিয়ে যায়। মনে মনে কত গালি দিয়েছি একসময় যেই মানুষটা কে, অমংঙ্গ কামনাও হয়ত করেছি, সেই তিনি পরম মমতায় আমাদের ছবি উপর হাত বুলিয়ে যাচ্ছেন বছরের পর বছর।

 

এক জীবনে আর কত ভূল হবে আমার। 

শুন্যতার রং

প্রিয় আহসান,

 

ব্লগে মামুনের কথা বলার জন্য তোমাকে কেন বেছে নিলাম এই প্রনশ তুমি আমাকে করতেই পারো। আমার কাছে সুনির্দিষ্ট কোন উত্তর কিন্তু নেই। একটা কারন হতে পারে, ব্লগে তুমিই একমাত্র, যার সংগে মামুনের যোগাযোগ হবার ক্ষীন হলেও একটা সম্ভাবনা আছে। আমার হিসাবে তুমি ৩৫ অথবা ৩৬ লংকোর্সের, ৩৮ এর পরে না নিশ্চয়ই, মামুন ছিল ৩৪ লংকোর্সে, আদি বাড়ি ময়মনসিংহ, ফর্সা, লম্বা করে, দুলিয়ে দুলিয়ে হাটত মামুন, মনে করতে পারো ওকে? কোম্পানীর কথা জানতে চেও না, আমি জানি না মামুন কোন কোম্পানীতে ছিল।

 

ক্লাস নাইনে ইলিয়াস যখন নতুন রূমমেট হিসাবে মামুন কে পছন্দ করল, ব্যাপারটা আমার একদম মনের মত হয়নি। কি দেখে পছন্দ করলি ওকে? জানতে চেয়েছিলাম। খুব ভাল মন, খুব রসিক। পরবর্তী দীর্ঘ চারটি বছর মামুন তার রসিকতা আর ভালমানুষি দিয়ে মাতিয়ে রেখেছিল আমাদের। আমার কাছে যদি কেউ জানতে চায় যে কোন সময়, কলেজে আমার প্রিয় সময় ছিল কোন গুলো, আমি অবশ্যই উত্তর দিব, অন্য আরও কিছুর সংগে, যে সময়টুকু আমরা রুমে আড্ডা মেরে কাটাতাম, অথবা রুমে ক্রিকেট খেলতাম, কিংবা স্কোয়াশ। এ রকম আড্ডা প্রিয় রসিক মানুষ খুব একটা দেখিনি। সবকিছু ব্যাখ্যা করার একটা নিজস্ব পদ্ধতি ছিল মামুনের এবং অবশ্যই সেটা হত খুব মজার একটা ব্যাপার আমাদের জন্য।

 

ইলিয়াস যে ফিজিক্সের জনপ্রিয় একজন স্যারের মেয়ের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে, এটা মামুনই প্রথম বলে আমাকে। ছুটিতে গোপনে গোপনে যে তাদের উপহারের আদান প্রদানও হয় এইটাও জানতে পারি তার মাধ্যমেই। ইলিয়াস ছিল বিখ্যাত প্রেমিক, বন্ধুর বোন থেকে শুরু করে, হিন্দি ছবির নায়িকা, বাদ যেত না কেউই। তাই ওতে আমরা অবাক হইনি, বরং কষ্ট লেগেছিল জবার কথা ভেবে, ইলিয়াসের নতুন প্রেমিক, তাও আবার স্যারের মেয়ে, কি এক কেলেংকারী অবস্থা।

পড়াশুনা নিয়ে সদা সর্তক মামুন বলেছিল, ডাক্তার হবে। ওর আর্মিতে চান্স পাওয়া শুনে আমরা বেশ অবাকই হয়েছিলাম। ফিজিক্যালি এত ফিট মনে হত না ওকে।  এরপর অনেকদিন কোন খবর নেই, যে যার ধান্দায় ব্যাস্ত আমরা তখন। তথন তো আর কোন মোবাইল ছিল না, ছিল না কোন গ্রুপ মেইল আইডি। তবে খবর পেতাম, এর ওর কাছে, সবার, মোটামুটি ভাবে, মামুনের খবর আলাদা করে চোখে পড়ার মত কিছু না। আছে মোটামুটি, মোটামুটি মানের অফিসাররা যেমন থাকে।

 

এর মাঝে আমারও কিছু পরিবর্তন হল, ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করলাম, চাকুরি শুরু করলাম, বন্ধুদের পাত্তা পেতে শুরু করলাম একে একে। গ্রুপ মেইল আইডি হল, মোবাইল হাতে উঠল, প্রিয় প্রিয় নামের পাশে নাম্বার সেভ হতে লাগল একে একে। একটু টাকা খরচ করলেই কথা বলা যেত, যোগাযোগ সহজ হয়ে গেল অনেকটা।

 

সেদিন অফিসে খুব ব্যাস্ত, বসের খুব তাড়া ছিল একটা কাজ নিয়ে, হঠাত ইলিয়াসের ফোন, বল তাড়াতাড়ি বল? দোস্ত, আমার বিয়ে। কি বলিস এইগুলা, মেয়ে দিল কে এইসব হাবিজাবি কথা সেরে আবার কাজে মন দিলাম। একটু পরে আবার ফোন, এইবার রেজা, হুমম, ইলিয়াসের বিয়ে, এছাড়া নতুন কি বল আমি তাড়া দেই।

ফয়েজ, মামুনের অসুক, লিভার সিরোসিস, ঢাকা সি্, এম, এইচে, অবস্থা খুব খারাপ, আজ রাতে সিংগাপুর যাবে। একটানে বলে রেজা। তোমার অফিস থেকে তো খুব কাছে, দেখো, দেখা করতে পার কিনা

 

বসের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে দৌড়ে যাই সি,এম, এইচে, অই তো মামুন, বিছানায় শুয়ে আছে। আশেপাশে এত লোকজন কেন? কিরে মামুন, শুয়ে আছিস কেন, কি হইছে তোর। মামুন আসলেই খুব ক্লান্ত, কথা বলতে পারে না, একটুকু কি হাসে আমাকে দেখে। ইশারায় বসতে বলে। আমি এ কোন মামুনকে দেখছি আজ এতদিন পর!!

 

মামুনের হাত ধরে বসি কিছুক্ষন, ইলিয়াসের কথাটা জানাই ওকে। জানিস, একটু আগেই ইলিয়াস ফোন করেছিল, বিয়ে করছে ওকাকে, জবাকে?। ক্লান্ত মুখে তার হাসির রেখা ফুটে উঠে, মৃত্যুর হাতে হাত রেখে রসিকতা, মামুনই পারে। আমার বুকে উঠে আসে দলা পাকানো কান্না।

 

এরপরের ঘটনা একদম সংক্ষিপ্ত, মাউন্ট এলিজাবেথ মামুনের অপারেশন করতে অস্নীকার করে, শতকরা ৮০% লিভার নষ্ট হয়ে গেছে মামুনের, অপারেশন করা মানেই মৃ্ত্যুকে কাছে ডেকে আনা। সিংগাপুর থেকে ফেরার সাত দিনের মধ্যে মারা যায় মামুন।

 

বছর ঘুরে, আমরা আবার আড্ডায় মাতি, বউ বাচ্চা নিয়ে ঘুরি, এটা ওটা করি। মাঝে মাঝে মামুনের কথা মনে হয়। বেচে থাকলে আড্ডায় আসত, বিয়ে করত, বউ নিয়ে ঘুরত। আমি যেভাবে আদর করি আমার মেয়েকে, ও হয়ত সেইভাবেই আদর করত, বুকে জড়িয়ে ধরত। আমাদের বয়স বাড়ে, মামুনের বাড়ে না, মামুন তার বয়স বেধে ফেলেছে তিরিশের আশেপাশে।

যান্ত্রিক আমাদের অনুভুতিতে আঘাত করে আর এক যন্ত্র। প্রতি বছর এপ্রিলের ১৪ তারিখে মেইল বক্সে ডুকলেই একটা মেইল দেখি

     

Title:

 

Death Anniversary of Mamun (586)

 

Date:

 

April 14

Time:

 

All Day

Repeats:

 

This event repeats every year.

Notes:

 

Lets mourn for our friend Mamun on this very date.

 

মরে তো আমরা যাবই, তাই বলে এই সময়, এভাবে?

 

শুন্যতার রং কি তুমি জান আহসান।

 

ভাল থেকো।

 

ফয়জুর।

(এইটা কিন্ত গল্পও নয়, কবিতাও নয়, প্রেম তো নয়ই। বরং এইটা গল্পের মত করে বলা কবিতা বা কবিতার মত করে পড়া গল্প।)

কলিং বেল চেপে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকি, মিষ্টি একটা পাখির ডাক ভেসে আসে। আমি জানি কিছুক্ষন এর মধ্যেই তুমি দৌড়ে আসবে। মুখে একরাশ হাসি, চোখে কৌতুক, ঠিক বুঝেছি তুই এসেছিস, আয় আয়

হাত ধরে টেনে নেবে ভিতরে।

 

ড্রইং রুম এর সামনের দোলনায় বসতে হবে প্রথমে, দুতিনটা দোলা দিবে তুমি আমায়, এরপর হাত ধরে টেনে নিবে রুমের ভিতর। কথা বলে যাবে অনর্গল, একটানা। আমি দুচোখ ভোরে দেখব তোমায়, কালো মুখ, চিবুকের ঘাম, চোখ উল্টিয়ে দ্রুত হাত নাড়া।

 

এত ঘন ঘন আসা যাবে না তোর, বুঝেছিস, মা নিষেধ করে দিতে বলেছেন, …আর তোরই বা এত দরকারটাকি আমার কাছে, বল, শিমুলের আম্মাও কেমন করে তাকায় এখন, একদম ভালো লাগে না আমার। তাছাড়া পড়াশুনা, সামনে টেষ্ট, তুই আসলেই দুই তিন ঘন্টা নষ্ট, তুই চলে গেলে পড়তে পাড়িনা পুরো দিন

 

দেড় দিন পরে আমি আবার যাই, কলিং বেল চিপি,  দৌড়ে আস তুমিএসেছিস, আয় আয়, বোস,

কতদিন পরে এলি, কেমন আছিস রে

 

 

 

 

পর্ব-সাজ্জাদ

 

ঠিক সূর্য্য উঠার আগে আগে, যখন মসজিদ থেকে লোকজন নামাজ পরে বের হয়, সেইসময়টায় রাস্তা দিয়ে হাটতে আমার খুব ভালো লাগে। সব কিছু সুনসান, একটা কেমন নিরব পরিবেশ, প্রকৃতিতে আর একটা ব্যস্ত দিনের প্রস্ততি, মাঠের ঘাস গুলো ভেজা ভেজা, পাখির ডাক, আমি বেশ অনুভব করি। দিনের আলো গলে গলে পরে আমার উপর, আমি যান্ত্রিক আর একটা দিনের প্রস্তুতি নেই।

 

কাল চলে যাব এখান থেকে, অনেক দিন থাকলাম, ৮ বছর তো হবেই, অনেক স্মৃতি, আনন্দ, বেদনা, হাসি কান্না, কুতসিত, বীভতস, কত পরিচিত মুখ, পরিচিত অনুভব, পরিচিত শক্র, পরিচিত পরিবেশ। অবশ্য এতে আমার অনুভুতিতে খুব একটা হাহাকার নেই, আমি ঘসে ঘসে অনেক শক্ত করেছি আমার মাংশপেশি। চলে যাব, যেতে হবে তাই, পিছে পরে থাক হাহাকার, আমার কি?

 

অনেক ব্যস্ত ছিলাম কালকে রাত অনেকটা পর্যন্ত, গোছগাছ, পুরানো জিনিস ফেলে দেয়া, কিছু পুরান জিনিস উপযুক্ত জায়গায় দিয়ে দেয়া, কিছু নিব ঢাকায় আর কিছু নিব রংপুর, এইসব অনেককিছু।

 

আর কিছু ছিল ফেলে রাখা হিসাব চুকানো। এসব কাজে জিসানকেই সাধারনত সাথে রাখি, ওর অনেকগুলো গুনের মধ্যে যেটা সবচেয়ে ভালো, কাজের সময় কোন প্রশ্ন না করা। যা বলি চুপচাপ করে যায়। প্রভুভক্ত কুকুরের মত। জিসানের এইগুনটা অবশ্য ধরতে পেরেছি অনেক পরে, যখন অপারেশন গুলোতে ওকে সাথে রাখতে শুরু করি। ওকে কাছে টেনেছি ওর মার দেয়ার ভঙ্গি দেখে, ফার্ষ্ট ইয়ারের একটা ছেলে এমন র্নিবিকার ভাবে কাউকে মারতে পারে, তাও ডাইনিং এর সামান্য ঘটনায় এটা জিসানের আগে কেউ করে দেখায়নি। মারার সময় ওর চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল, মার দেয়াটা অনেক উপভোগের একটা কাজ।

 

আমার শুরুটা অবশ্য এরকম ছিল না। খুব ভালো রেজাল্ট নিয়ে পড়তে এসেছিলাম বাবার আশা পুরনের জন্য, প্রথম বছরটা ভালোই ছিলাম, রেজাল্টটাও ছিল বেশ ভালো। খামোখা আমার রুমটা পুড়িয়ে, মেরে রুমথেকে বের করে না দিলে হয়ত জীবনটা এমন হত না। অই ঘটনার পর পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে বেশ কদিন। আমার আপরাধ,  যোবায়ের ভাই আর আমি একই এলাকার ছেলে, যোবায়ের ভাই পার্টি করতেন, গ্রপিং ছিল, আর যেটা করতেন তা হল আমাকে আদর করতেন ছোট ভাইয়ের মত। রুম পুড়ানোর পরের তিন মাসের মধ্যে ছবির মত অনেক কিছু ঘটে গেল, ক্যাম্পাসে ফিরে এলাম বীর দর্পে, যোবায়ের ভাই সহ, সব কিছুর নিয়ন্ত্রন নিয়ে নিলেন যোবায়ের ভাই, আমি পেলাম ভালো পোষ্ট। কোন কিছু না বুঝেই অন্যের কথা আর খবরের কাগজ পড়ে বাবা ভুল বুঝলেন, মাস্তান হয়ে গেছি এই অপবাদ দিয়ে বাবা ত্যাগ করলেন আমাকে। বাসায় যেতে নিষেধ করলেন কারন ছোট ভাইটাও নাকি নষ্ট হবে আমার সাথে মিশে, আর, আর শম্পা ফিরিয়ে দিল ডাইরিটা।

 

জীবন টা বদলে গেল আমার। যোবায়ের ভাই চলে যাবার পর পুরোটা নিজের করে নিতে খুব একটা কষ্ট হয়নি, গ্রুপে জিসান চলে এসেছে এর মধ্যে।

 

রেজাল্ট খুব একটা ভালো হয়নি, পাশ করেছি, ভালো হবার কথাও নয় অবশ্য। বরং আমাকে সামনে রেখে রেজাল্ট ভালো করে নিল ফারজানা, মোটামুটি চেহারার মেয়ে, খুব উচ্চকাংখি, ফিজিক্সে পড়ত। আমাদের একটা বোঝাপড়া ছিল, আমার প্রয়োজনে ওকে কাছে পেতাম, সবাই জানতো আমরা প্রেম করি, এই সুবাদে কিছু একাডেমিক সুবিধা নিত সে, আমাকে কিছু করতে হত না, যা করার ফারজানাই করত, কারন ফারজানা তখন ক্যাম্পাসে পরিচিত মুখ, আমার সংগে ঘুরে। ফারজানার প্রয়োজন ফার্ষ্ট ক্লাস, আর আমার প্রয়োজন, মাংসের স্বাদ, আর্তনাদ আর শীতকারে মিলিত অনুচ্চ ধ্বনি, শরীরের রি রি কাপন। অন্য সবার থেকে ফারজানাই কাজটা সবচেয়ে ভালো জানত, তাই ফারজানার প্রথম শ্রেনীতে আমার কোন আপত্তি ছিলনা। আমিতো সুনীল নই, শুধু গন্ধে আমার হয় না, আর তাছাড়া যার গন্ধ নিতে চাইতাম সে সরে গ্যাছে ততদিনে। তাই ফারজানা, গত বছর পাশ করেছে, শুনলাম বিদেশে পি, এইচ, ডি করে এইরকম একজনকে বিয়ে করে এখন আমেরিকায়। আমি খোজ নেইনি, প্রয়োজন নেই, ফারজানাও বুদ্ধিমান মেয়ে, আর যোগাযোগ রাখেনি। 

 

শম্পা বিয়ে করেছে এক কেরানিকে, পাচ হাজার টাকা বেতন। একটা বাচ্চা হয়েছে, বাচ্চাটার পেটে টিউমার, বলেছিলাম দেশের বাইরে নিয়ে যেতে, আমি খরচ দিব, রাজি হল না। অনেক নীতিকথা শুনিয়ে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে। আর নীতিকথা শুনিয়েছেন মা। পাপের টাকায় হাত দিবেন না, মরে যাবেন তবুও। বাবা তো এসব নিয়ে এখন আর ভাবেনই না। শালার জীবন একটা। মাঝে মাঝে ছোট ভাইটা আসে, ভাল করছে বুয়েটে, টুকটাক কথা বলে, আমাকে নিয়ে ওর বুক চেরা দ্বীর্ঘশ্বাস অনুভব করি। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে আমি আমার অচেনা আমিকে খুজি।

 

আরো এক দু বছর থাকা যেত, কিন্ত ক্যাম্পাস ছাড়ছি প্ল্যান মতই। এলাকার এমপি নুরু ভাইয়ের অবস্থা ভালো না। এবার হারবে নিশ্চিত, তবু তার সংগে কাজ করবো এইবার। সব কিছু একবারে নিয়ে নেবার আগে একটা উপলক্ষ লাগে। উপলক্ষ রেডি হয়েছে। এবার নুরু ভাইয়ের সংগে খুব কাজ করতে হবে, কিন্ত এন্ড অব দ্য ডে ওনাকে ইলেকশনে হারতে হবে। কারন পরের র্টামটা আমার। আর জিসান একটু অর্ধৈয্য হয়ে গেছে দেখি, কিছু দিন পরে কথা আর নাও শুনতে পারে। এখানকার সব কিছু রেডি করে নিয়েছে ওর নিজের জন্য এই খবর আমি পেয়েছি, এখন আমি নিজে থেকে না গেলে সমস্যা হতে পারে।

 

মিনহাজের কাজটা বাকি থাকল। কালকেও খুজতে বেরিয়েছিলাম জিসানকে নিয়ে, গ্রপ বদল যে সহজ নয় এটা বুঝানো দরকার ওকে। গ্রপ বদলই শুধু না, একমাত্র এল, এম, জিটা নিয়ে বেচে দিয়েছে। প্ল্যান ছিল ওকে ধরে প্রথমে জিসানের হাতে দিব, মনের সুখে পিটানোর জন্য। এরপর, চৌরাস্তার মাথায় নিয়ে পা দুটো ভেংগে দিব যাতে দৌড়াতে না পারে, এরপর সারাগায়ে অকটেন ঢেলে পায়ে একটা গুলি করব। আগুনে পুড়িয়ে মারব ওকে, যাতে এই ভুল করার আগে তিনবার ভাবে অন্যরা। জিসানকে বলেছি প্ল্যানটার কথা, কিন্ত আমি চলে গেলে ও মনে হয় এত কষ্ট করবে না মিনহাজকে শায়েস্তা করতে। এনি ওয়ে, ওর রাজত্ব, ও যেভাবে খুশি চালাক।

শম্পা আর আমার লেখা যে ডাইরিটা ছিল, ওটা কাল রাতে পুড়িয়ে ফেলেছি। প্রায় এগার বছর ডাইরিটা বয়ে বেড়ালাম। আর কত? ডাইরিটা দুমাস থাকত আমার কাছে, পরের দুমাস শম্পার কাছে। সেই আমি যখন ক্লাস টেনে, আর শম্পা এইটে তখন থেকে ওটা লেখা শুরু করি আমরা। আমাদের ঘিরে আমাদের যে অনুভুতি, তার সব আমরা লিখে রেখেছিলাম ওখানে। প্রায় চার বছরের অনুভুতি কালো অক্ষরে লেখা আছে ডাইরির পাতায় পাতায়। আমার এ পথে আসার পর শম্পা ডাইরি নিতে অস্বীকার করে। অথচ কথা ছিল অন্যরকম। কথা ছিল আমরা বিয়ের পর একসংগে ডাইরি পড়বো। আমাদের ছেলে মেয়েদের দেখাবো আমাদের অনুভুতির প্রকাশ। এখন তো আর এগুলো হবে না, কি লাভ বোঝা বাড়িয়ে, আরও অনেক আগেই পুড়িয়ে ফেলা উচিত ছিল ওটা।

 

কাল চলে যাব এখান থেকে। পরবর্তী দশ বছরের প্ল্যান করা আছে। ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে প্রথম যাব গুলশানে। একটা ভালো করে ম্যাসাজ নিতে হবে। এরপর অন্যকিছু।  

  

(ফারজানা তাবাসসুম বলছি)

 

আমার দেখা পৃথিবী সবথেকে কুতসিত কাপল হচ্ছে মিষ্টার হোদল কুঁত কুঁত আর মিসেস ডিম্পল কাপাডিয়া। মিজ কাপাডিয়া কি দেখে যে হোদলটাকে বিয়ে করেছে, এই হিসাব আমি সারা জীবনে মিলাতে পারব বলে মনে হয় না। একসংগে পড়ত এইটা জানি, হোদল খুব মেধাবি, তাও মানি, কিন্তু এই গুলোই কি সব, নাকি তাদের মধ্যে বিয়ের আগেই কোন বোঝাপড়া হয়েছিল। হতে পারে, হলেই ভালো, হিসাব মিলানো সহজ হয়।

 

হোদলটা আসলেই খুব মেধাবি, বুঝা যায়। যেখানে হাত দিয়েছে, সোনা ফলেছে, বিশেষ করে ব্যবসায়, ১৭/১৮ বছর আগেও, যখন আমার বয়স ছয় কি সাত, আমরা থাকতাম মিরপুর, আর এখন হোদলের গুলশানে একটা ফ্ল্যাট, উত্তরায় সিংগেল ইউনিট বাসা, ধানমন্ডিতে আপার্টমেন্ট, সবার জন্য আলাদা গাড়ি। এর মধ্যে হোদলের গাড়ি দুইটা, একটা জিপ আর একটা কার, কাপাডিয়ার বি এম ডব্লিউ, আর আমার জন্য টয়োটা। এইগুলো আমার জানার মধ্যে, না জানা কি আছে জানি না। হোদলটা মেধা কাজে লাগিয়েছে শুধু মাত্র নিজের উন্নতির জন্য, পয়সা বানানোর ধান্ধায়। তবে মনে হয় না কাপাডিয়ার পয়সা ছাড়া আর কোন চাহিদা আছে হোদলের কাছে।

আর একটা কাজে হোদলটা তার মেধার সর্বচ্চো প্রয়োগ করেছে বলে ধারনা আমার। প্রতি বছর বাংলাদেশের সেরা সুন্দরী একটাকে খুজে বের করে হোদলটা। পারসোনল সেক্রেটারি পোষ্ট নিয়ে কোম্পানিতে জয়েন করে ডানাকাটা এক পরী। দুবছরের কন্ট্রাট থাকে নাকি ওদের। হোদলের মোট সেক্রেটারি তিন জন, এর মধ্যে একজন সবসময় থাকে, বাকি দুজনের মধ্যে প্রতি বছর একজনের চাকুরী বদল হয়, নতুন আর একটা পরী আসে। শীতের শুরুতে হোদলটা নতুন পরীটাকে নিয়ে দেশের বাইরে বিজনেস ট্রিপে যায়। শুনেছি, যে একবার হোদলের সেক্রেটারি হয়েছে, তার সারা জীবন আর কিছু না করলেও চলে।

 

কাপাডিয়া ব্যাস্ত পার্টি নিয়ে, কোন ক্লান্তি নেই। উরে মারে মা……………।। এত গিলতে পারে এই মহিলা। আর শরীর, মাশাআল্লাহ, মধ্য চল্লিশ, দেখে বুঝার কোন উপায় নাই। আমি যে একটা মেয়ে, পচিশ ছুই ছুই, অই মহিলার পেট থেকে বের হয়েছি, কেউ মানতে চায় না প্রথমে। এখনও মনে পড়ে, আমি যখন প্রথম বুঝতে শিখি ছেলেদের চোখের ভাষা, আমি আর কাপাডিয়া একসংগে বের হলে কেউ বুঝতেই পারত না আমরা মা মেয়ে। একেত আমাদের চেহারার অমিল, কাপাডিয়ার প্রায় কিছুই আমি পাইনি, যত না পেয়েছি হোদল কুঁত কুঁতের, সবাই মায়ের দিকে আড় চোখে তাকাত, অনেক সাহসিরা সরাসরি, আমার দিকে প্রায় কেউই তাকাত না। আমার খুব হিংসে হত তখন কাপাডিয়াকে, পরিচিতরা যখন হাত মেলাত কাপাডিয়ার সংগে, পরিচয় দিত, প্লিজ মিট উইথ মাই ডটার বলে, সবাই অবাক হত আমাকে দেখে। প্রথম বুঝতাম না কারনটা, সিন্থিয়া বুঝিয়ে না দিলে হয়ত বুঝতামও না। তবে তাদের অবাক চোখ দেখে কাপাডিয়া যে ভীষন গর্ব অনুভব করত তা বুঝতে পারতাম খুব সহজেই। কাপাডিয়া আর হোদলটা একই বাসায় থাকে, পাশাপাশি রুম, কিন্তু কবে শেষ কথা বলেছে ওরা হাসিমুখে, আমার মনে নেই। কাপাডিয়া বরং অনেক সহজ আংকেলদের সংগে, অনেক আংকেল আছে আমার, ছোট কালে অনেক রকম আদরও করতে চেয়েছিল, এক আংকেলকে তো চড়ই মেরেছিলাম, বুদ্ধিটা অবশ্য সিন্থিয়া দিয়েছিল। খুব মজা হয়েছিল, একদিন কাপাডিয়ার সামনে জানতে চেয়েছিলাম, তার গালের ব্যাথা কমেছে কিনা? কাপাডিয়া তো অবাক, সেকি রাশেদ ভাই, আপনার গালে ব্যাথা, আমি তো জানলামই না বকের মত মুখ হয়ে গিয়েছিল ব্যাটার, খুব মজা পেয়েছিলাম, এখনো হাসি পায়।

 

সিন্থিয়াই একদম কাছের বন্ধু, সেই স্কুলে থাকতে পরিচয়, কত কিছু শিখিয়েছে আমাকে। ওর বাসা আবার ভরা ছবি দিয়ে, কত কালেকশন ছিল ওর। ও অবশ্য বলত ওর ভাইয়ার কথা, ও নাকি মেরে দিয়েছে। যাইহোক, জীবনের সবথেকে চ্যালেঞ্জিং ব্যাপারটা ওই শিখিয়েছে, সবচেয়ে মজা লাগত যখন আমরা নিজেদের মধ্যে প্র্যাকটিস করতাম, নিজেদের ভিডিও নিজেরাই দেখতাম। ওর ভাইয়া, ওর ভাইয়ার বন্ধু, ও আর আমি যেবার কক্সবাজার বেড়াতে গেলাম, সেবারের এক্সপেরিয়েন্স তো তুলোনাবিহীন, এগুলোর ভিডিও রাখতে পারলে দারুন হত, কিন্তু সিন্থিয়াই না করেছিল, ছেলেদের নাকি একদম বিশ্বাস করতে নেই, প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলে ছুড়ে ফেলতে হয়, দেরি হলে ওরাই ছুড়ে ফেলবে।

 

সাজ্জাদকে মনে হয় ভালবাসতাম, বাসতাম কি? কি জানি? হয়তো হ্যা, কিংবা না! তবে ওর মধ্যে আগুন ছিল। পুড়তে ভাল লাগত। তাছাড়া সিন্থিয়া আমেরিকায় চলে যাওয়াতে অনেক একা লাগত। ক্যাম্পাসে সবাই সাজ্জাদকে কেন যে এড়িয়ে চলত? হতে পারে, ওর তেজী ভাবটা, কিন্তু আমার আবার ওইটাই সবথেকে ভাল লাগত। ওর আগুনে পুড়ে পুড়ে মনে হত আমি সোনা হচ্ছি। ওকে বললে কি আমরা একসংগে থাকতে পারতাম সারাজীবন? কিন্তু সংসার মানেই তো হোদল কুত কুত আর ডিম্পল কাপাডিয়া। আমি না হয় কাপাডিয়া হলাম, কিন্তু সাজ্জাদ তো হোদল চরিত্রে একদম বেমানান। সাজ্জাদকে ভালবাসা যায়, কাছে টানা যায়, সময় কাটানো যায় কিন্তু ওর সংগে অভিনয় করা যায় না।

 

সাজ্জাদের একটা গোপন ডাইরী ছিল, লুকিয়ে লুকিয়ে কতবার যে পড়েছি ওইটা।, কিশোর বয়সের অনুভুতি এমন হয় নাকি? ইটস লাইক আ হ্যাভেন……… আই কান্ট বিলিভ।

 

ডাইরী পড়ে আমার, কেন জানি শম্পাকে খুব দেখতে ইচ্ছে হত। ঠিক বললাম কি? না মনে হয়। আমার আসলে শম্পা হতে ইচ্ছে করত।   

 

 

যোবায়ের-কথন

 

০০০০০০০

-হ্যালো যোবায়ের সাহেব বলছেন।

-বলুন

-দেখুন, আমি …… বলছি। গত দশদিন ধরে আপনি যেখানে যেখানে যান, ক্যান্টিন, দুলু ভাইয়ের দোকান, হল, হলের ক্যান্টিন, সবখানে আমরা একটা মেসেজ দিয়েছি, আপনি কি এটা পাননি। আপনার হলের প্রভোষ্ট এবং ডিন কেও মেসেজ দেয়া ছিল।

- পেয়েছি, কিন্তু দরকার মনে করিনি, এনিওয়ে, পেয়ে তো গেলেন, এখন বলুন কি চান?

- আপনার সংগে একটু সামনাসামনি কফি খেতে চাই। কালকে আসুন এখানে।

- আমাকে ডিক্টেট করবেন না, আচ্ছা রাখি।

 

০০০০০০০

-হ্যালো যোবায়ের সাহেব।

-আবার আপনি।

-সাজ্জাদকে বেশি বিশ্বাস করাটা কিন্তু বোকামি হচ্ছে। মিছিলে যাননি, এটা কিন্তু জিসান, মিনহাজ কেউ পছন্দ করেনি। খারাপ অবস্থাতো, কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না।

-অনেক খবর রাখেন দেখি। শুনুন, এরা আমার কাছের লোক, আমাকে না বলে কিছু করেনা।

-রাখতে হয় যোবায়ের সাহেব রাখতে হয়। এত বড় একটা ইস্যু, চোখ তো রাখতে হয়ই, আমরা তো চাকুরি করি। আচ্ছা আপনার বাসায় হাজার দুয়েক টাকা পাঠানো হয়েছে। আপনি তো অনেকদিন যান না, বাসার খবর রাখেন না, একটু টানাটানি হচ্ছিল, টাকাটা পাওয়াতে আপনার মায়ের খুব সুবিধা হয়েছে। আমরা বলেছি আপনি পাঠিয়েছেন, এখন ব্যাস্ত, আসতে পারছেন না, আরও বলেছি, এটা টিউশনি করে কামিয়েছেন। আর কিছু করেনা বললেন, যোবায়ের সাহেব, কালকে রাতের মিটিং কিন্তু আপনাকে ছাড়া হয়েছে, সাজ্জাদ সভাপতিত্ব করেছে। আপনার অনুমতি ছিল কি?

-দেখুন, এসব করে লাভ হবে না। অনুমতি ছিল, আমি পার্টি অফিসে ছিলাম।

-লাভের জন্য করি নাই, আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড জানতে গ্রামে গিয়ে দেখি এই অবস্থা। কষ্ট লাগলো চাচা চাচিকে দেখে। দায়িত্ববোধ থেকে করেছি। আর মিটিং এর কথা বলছেন, আপনার পার্টি অফিসের মিটিং ঠিক হয়ে ছিল চার দিন আগে থেকেই, হঠাত করে এই মিটিংটা ডেকেছে সাজ্জাদ, কারন ও জানে আপনি ওইদিন থাকবেন না। আপনি কিন্তু পিছাতে বলেছিলেন, কাজ কি হয়েছে? জিসান, মিনহাজ ওদেরও তো বলেছিলেন আপনার অসুবিধার কথা। কেউ তো শুনলো না।

- দেখুন, আমার কথা যদি কেউ নাই শুনে তাহলে আপনি আমার পিছনে খামখা সময় কেন নষ্ট করছেন। টাকা পাঠানোর জন্য ধন্যবাদ, এখন রাখি কেমন।

 

০০০০০০০০০০০

-যাক আসলেন তাহলে। আমি তো আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম।

-আপনার কিছু কিছু তথ্য বিভ্রান্তিকর, তবু আসলাম কারন সাজ্জাদ সর্ম্পকে আপনার অনুমান সঠিক, সে আমাকে সরিয়ে দিতে চাইছে। তবে এখনো সময় আছে, কারন তৃনমূল কর্মিদের সমর্থন, আর পার্টি আমাকেই চিনে, ক্যাম্পাস বলতে আমাকেই বুঝে।

-যাক এতদিন পরে আপনার আর আমার একটা হিসাব মিলল। তো কি খাবেন, চা নাকি কফি। খেতে খেতে কথা বলি।

 

 

০০০০০০০০০০০

-         সাজ্জাদ কালকের কার্ফু এর সময়কার কি প্ল্যান।

-         আগের মতই, সাংস্কৃতিক গোষ্টি গান করবে, পথ নাটিকা আছে, শিক্ষকরা মৌ্ন মিছিল করবে।

-         ছাত্রদের মিছিলের কি অবস্থা, ছাত্র হবে তো, ঈদানিং একটু কম কম মনে হয়।

-         কি যে বলেন না যোবায়ের ভাই, বরং আপনাকে একটু বিভ্রান্ত লাগে।

-         একটু তো টেনশন হয়ই, পুরা কন্সটিটিউশনের এগেইন্সষ্টে তো।

-         যোবায়ের ভাই, এইগুলা কি বলেন, সব পার্টির একদাবি, মিডিয়া, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবি, সংবাদকর্মী, দল, লিগ সব এক কাতারে, আপনি জানেন এইগুলা, কত কষ্ট করে এই জায়গায় আসছি আর আপনি এখন এইগুলা কি বলেন।

-         কালকে বক্তব্য কার কার।

-         বড় দুই দলের ছাত্র বিশয়ক সম্পাদক আসবেন, ডিনস কমিটির চেয়ারম্যান আর ছাত্রনেতা অই সময় যারা যারা থাকবেন। আর যোবায়ের ভাই, আপনি ঠিক থাকেন, এইটা ছাত্র আন্দোলন, এর গতি ছাত্ররাই ঠিক করবে, আমি আপনার কাছ থেকে সব শিখেছি, আপনি বিভ্রান্ত হলে এই আন্দোলন গতি হারিয়ে ফেলবে।

-         আরে না, কি যে বল, গতি হারাবে না, আমি তো মরেও যেতে পারি, তোমরা আছ না।

-         যোবায়ের ভাই, আপনি ঠিক থাকেন, এখন অনেকে অনেক কথা বলবে, কিন্তু আমরা আমাদের কাছ করে যাব। ইটস আ ওয়ান ওয়ে রোড, জিততেই হবে।

-         হুমম সাজ্জাদ, সিমস আই হেট পলিটিক্স।

-         আমরা সবাই তাই, কিন্তু তীর ছোড়া হয়ে গ্যাছে, ফিরার উপায় নাই।

 

০০০০০০০০০০০

-         যোবায়ের ভাই আপনার বক্তৃতা অস্পষ্ট। দিক নির্দেশনা নেই।

-         মিনহাজ, আমি আর একটু দেখতে বলেছি, সরকার দাবি বিবেচনা করবে বলছে, আমাদের সময় দেয়া দরকার।

-         আপনার কথা বিভ্রান্তিকর। গত মাসে আপনি ছাত্র জমায়েতে আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন। এখন ছাত্রদের বিভ্রান্ত করছেন।

-         মিনহাজ তুমি আমার চেয়ে এইসব বেশি বুঝ না নিশ্চয়। আর আমার সামনে চড়া গলায় কথা বলবানা। তোমাদের …… ক্ষমতা আমার জানা আছে।  

 

০০০০০০০০০০

-যোবায়ের সাহেব, আপনি মনে হয় ছাত্রদের উপর আপনার কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলেছেন। আপনার কথা শুনছেনা তারা।

-এভাবে হবে না। শক্তি প্রয়োগ করতে হবে।

-শক্তি প্রয়োগে কিছু হয়না। গত তিন বছর কিছু হয়নি, রেকর্ড তাই বলে।

-এবার হবে, আমি থাকব।

- আপনি কি বলতে চান স্পেসিফিক্যালি বলুন।

————————————————-

-         আপনার মাথা খারাপ হয়ে গ্যাছে যোবায়ের সাহেব। একটু বসুন, চা বা কফি দিতে বলি। নিচে গাড়ি আছে, বলে দিচ্ছি, যেখানে নামতে চান নামিয়ে দেবে।

-         এইটাই একমাত্র রাস্তা।

-         রাস্তা নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। আপনি চা খান, একটু ঢাকার বাইরে থেকে ঘুরে আসুন। আমরা তিনদিন পরে আবার কথা বলি। ও আর হ্যা, কেউ কি নেই আপনার সংগে।

-         আছে কয়েকজন, মধ্যম সারির, বিভিন্ন হলে থাকে।

-         অসুবিধা নাই, নেক্সট জমায়েতের আগে কিছু একটা প্ল্যান করে ফেলব, আপনি যান, বিশ্রাম করুন।

 

 

০০০০০০০০০০০

-স্যার, কত কিছুদিন থেকে একজন লোক ফ্ল্যাটের আশপাশে ঘুর ঘুর করে, আপনাকে খুজে।

-আমাকে খুজে এইটা বুঝছিস কিভাবে?

-স্যার আপনার নাম কইছে? কইছে সাজ্জাদ সাহেব এইখানে আসেন কিনা?

-তাই নাকি, তারপর।

-আমি কইছি, মাঝে মাঝে আসে, আপনারে দেওয়ার জন্য চিঠি দিছে একটা।

-দেখি চিঠি দে, বেকুব কোথাকার।

 

০০০০০০০০০০০০

-অনেক দিন পরে তাই না সাজ্জাদ।

-যোবায়ের ভাই, কেন খুজছেন বলেন।

-ঘৃনা হচ্ছে নাকি আমাকে?

-স্বাভাবিক, আমি এসেছি কারন আমি আপনার মত বেঈমান নই, আমার এই অবস্থানের পিছনে আপনার আবদান আমি ভুলিনি।

-শুনে খুব ভালো লাগল। ভাবছিলাম তুমি কি ভাবে নিবে?

-সব শালা কি আর মিরজাফর হয় যোবায়ের ভাই, এনিওয়ে কেমন আছেন?

-আর থাকা, জানই তো।

-কি চাচ্ছেন বলুন এবার।

-তুমি খুব শার্প সাজ্জাদ, আমাকে দেশের বাইরে যাবার একটা ব্যাবস্থা করে দাও।

-দুমাস পরে এইখানে আসবেন। সব রেডি থাকবে। তবে একটা শর্ত আছে।

-অসুবিধা নাই, আগামি তিন বছর আমি দেশে আসব না।

-তিন না, যোবায়ের ভাই, আগামি দশ বছর, আপনি দুই টার্ম পরে আসবেন।

-ঠিক আছে, তুমি বাড়ির খোজ খবর রাখিও।

-আর একটা প্রশ্ন

-বল

-মিছিলে এলোপাতাড়ি গুলি করলেন ক্যানো? তাও আবার দাংগা পুলিশ নিয়ে?

-কেউ কিন্তু মারা যায়নি।

-যেতে পারত।

-সাজ্জাদ, মানুষ ভুল করে, কারন সে মানুষ, আমি আসব দুইমাস পরে, বেচে আছি যেহেতু, দেখা হবে নিশ্চয়।

-আপনার সংগে দেখা করতে চাই না। অন্য কেউ আসবে, আপনার কাজ হয়ে যাবে।

 

 

(লেখকের টুকিটাকি কথা)

 

সচেতন পাঠক হিসেবে তো বটেই, এই সিরিজে লেখক হিসেবেও আমি মনে করি, এইখানে সিরিজ শেষ করাটা ঠিক হচ্ছে না। আরও কয়েকটা পর্ব আসা উচিত। শম্পার কথা যদি নাও গুনি, তবুও মিনহাজ আর জিসান কে নিয়ে অন্ততঃ আরও দুটো পর্ব আসলে ব্যাপারটা একটা কিছু হলেও দাড়াতে পারত।

 

উলটো পিঠের যুক্তিও আছে, একেবারে ফেলনা না সেগুলোও। সিরিজের নাম নব্বইয়ের হ্যামলেট, অর্থটা পরিষ্কার, নব্বই দশকের এমন কিছু চরিত্র, যারা নিজেকে বার বার খুজছে বা বদলাচ্ছে। সিদ্ধান্তহীনতার আক্ষেপ, সিদ্ধান্ত নিতে না পারার হতাশা, ভুল সিদ্ধান্তের জন্য অনুশোচনা, বা সিদ্ধান্ত বদলানো এবং এর পিছনের কারন হিসেবে নিজের মনকে বুঝানো এইসব ফুটিয়ে তোলা। মিনহাজ, জিসান শম্পারা এই দলে ঠিক পরে না। কারন এরা সহজে সিদ্ধান্ত বদলায়নি, অন্ততঃ আমার জানা মতে। আর দ্বিতীয় কারনটা, শম্পা ছাড়া বাকি দুজনের সংগে আমার তেমন ভালো চেনাজানা নেই, তাই তাদের মানসিকতার ব্যাপারটা আমি ফুটিয়ে তুলতে চাইলে, হয়ত, ভুল জিনিস উঠে আসত। ভুলটা এড়াতে চাইলাম। তবে মিনহাজ, জিসানকে নিয়ে নষ্ট প্রজন্ম বা এইরকম কিছু নাম দিয়ে কিছু একটা লেখার চিন্তাটা মাথায় রাখলাম।

 

আমার পরিচয়টা এই ফাকে দিয়ে নেই, পাঠক বুঝতে পারবেন আমি কিভাবে জড়ালাম নিজেকে। সাজ্জাদ আর আমি ছেলেবেলার বন্ধু। একই স্কুলে পড়তাম, আমার এবং সাজ্জাদের বাবা সেই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। ভাল ছেলে বলতে যা বুঝায় আমরা ছিলাম তাই। প্রথম এবং দ্বিতীয় স্থান আমাদের জন্য নির্ধারিতই ছিল একরকম, অন্যরা পরীক্ষা দিত তার পরের স্থান গুলোর জন্য। এইসব ভালোছেলে টাইপ গুনাবলী দিয়ে ভর্তি ছিলাম আমরা, যেমন থাকে আরকি ভালোছেলেদের, কথা ওদিকে না গেলেই মনে হয় ভালো হবে।

 

বায়োকেমিষ্ট্রি ছিল আমার সাবজেক্ট, সাজ্জাদের আ্যপ্লাইড ফিজিক্স, ওর রুমে আমিও ছিলাম, যোবায়ের ভাই আমাকেও খুব আদর করতেন, হল থেকে আমিও বিতারিত হয়েছিলাম এই অপরাধে, ইউনিতে মিল বলতে ছিল এইগুলা। আর একটা মিল ছিল, আমরা ওইখানেও খুব ভালো বন্ধুও ছিলাম।

 

বাকি সব অমিল আর অমিল।

 

প্রথম অমিল শুরু হয় ঘটনার মুল্যায়ন দিয়ে, সাজ্জাদ প্রতিবাদী হয়ে উঠে, আর আমি আরও ভালো ছেলে হয়ে উঠি। ওর রেজাল্ট খারাপ হতে থাকে, আর আমার ভালো থেকে ভালো হতে থাকে। সাজ্জাদের পরিচিত বাড়তে থাকে, আর আমি পরিচিতি পাই গুটি কয়েকজনের কাছে, অন্যরা আমাকে আতেল নামে ডাকে। সাজ্জাদের লাইফ ষ্টাইল অনেকের কাছে অনুকরনীয় হয়ে পরে, রোল মডেলের মত, আর আমি, ঘরকুনো ইদুর কিংবা তেলাপোকার জীবন (সাজ্জাদের ভাষায়), ক্লাস, ক্যান্টিন, হল, লাইব্রেরী এই…

 

৯০ এর পট পরিবর্তন সাজ্জাদকে আরও বেপরোয়া করে তোলে, প্রমোশনের জন্য শিক্ষকরা তার কাছে তদবীর নিয়ে যায়, ভাইস চ্যান্সেলর হবার জন্য একজন ডিনের সংগে সাজ্জাদের মিটিং ক্যাম্পাসে তোলপাড় তোলে। আমি তখন মাষ্টার্স নিয়ে খুব ব্যস্ত।

 

মাষ্টার্স এর পর স্বাভাবিক ভাবেই, ভালো চাকুরি, GRE,  বাইরে পড়তে যাওয়া, বাইরে নিজেকে তৈরী করা, বাবার মৃত্যু, আরও অনেক কিছু নিয়ে বেশ ব্যস্ত। অনেকদিন পড়ে যখন মনে হবার মত করে মনে হল প্রিয় বন্ধুটির কথা তখন আমি বেশ প্রতিষ্ঠিত, তরুন গবেষক হিসেবে কিছু নাম ডাক, সেমিনার গুলোয় ডাক পরে, ওদের খরচে নিয়ে যায় এখানে ওখানে। জীবন সহজ থেকে সহজ হতে থাকে।

 

জাকসন হাইটে মাঝে মাঝে বাংগালী আড্ডায় যাই, অন্য কিছু না এমনি বেড়ানো। সেইখানে হঠাত একদিন দেখি আমার বন্ধু সেই ছোটবেলার সাজ্জাদ ঘুরে বেড়াচ্ছে।

 

আমি আক্ষরিক অর্থেই অবাক হয়ে যাই, সাজ্জাদ এখানে, এত কম বয়স!!, ঠিক যেন আমার ১২ বছরের বন্ধুটি ব্লু জিন্স আর টি শার্ট পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি তাকে ডাকি কথা বলার জন্য। তার সংগে কথা বার্তা আমেরিকান ইংলিশে যা হল তা মোটামুটি এইরকমঃ

-হাই

-ও, হাই,

-আমি কি তোমার সংগে একটু কথা বলতে পারি।

-নিশ্চয়ই।

-তোমার গেটাপ খুব সুন্দর, তুমি কোথায় থাক?

(১২ বছরের সাজ্জাদ বলে কোথায় থাকে ও)

-         কিছু মনে কর না, তুমি কি ইন্ডিয়ান?

-         না আমি বাই বর্ন আমেরিকান, কিন্ত মা বাংলাদেশী।

-         বাবা? (আমি কি একটু উত্তেজিত)

-         আমি এখন ষ্টেপ বাবার সংগে থাকি, উনি আমেরিকান।

-         তুমি কি প্রায়ই আস এখানে?

-         প্রায় না, মাঝে মাঝে আসি, তবে মা আসেন প্রায়ই।

-         আমার খুব ভালো লাগত যদি তোমার মায়ের সংগে পরিচিত হতে পারতাম।

-         ওই তো মা, শপিং করছে, যাও না কথা বল, আমি ডেকে আনব?

 

আমি দেখি, যদিও বেশ খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে, অনেক দিন আগে শেষ দেখেছি, কিন্ত ফারজানাকে চেনা যায়।

 

লেখকদের নাকি ঘৃনা থাকতে নেই, কিন্ত ফারজানাকে যখন প্রথম দেখি, তখন থেকে ওর জন্য আমার হূদয়ে ঘৃ্না ছাড়া আর কিছু নেই, আর এখন ফারজানাকে দেখে সেটা গলা পর্যন্ত পাকিয়ে আসে, আমার বমি বমি ভাব আসে, বাতাস হারিয়ে যায়, মাথাটা বনন করে ঘুরে উঠে। আমার উচিত এখান থেকে দ্রুত কেটে পড়া, এবং জাকসন হাইটে আর না আসা।

 

কিন্তু ষ্টুপিড পা আমার কথা শুনে না, একমিনিট পড়ে আমি দেখি আমি ফারজানার পিছনে দাঁড়িয়ে ওকে ডাকছি।

 

ফারজানার মুখের দিকে তাকিয়ে খুব অল্প সময়ের মাঝেই আমি অনেক গুলো পরিবর্তন দেখতে পাই, প্রথমে কাউকে চিনতে না পারা, এরপর একটু একটু করে চিনতে পারা, এরপর পুরোপুরি চিনে ফেলার আনন্দ এরপর নিজেকে লুকিয়ে রাখার আপ্রান চেষ্টা করে ফারজানা, অল্প পরেই বুঝতে পারে না চেনার ভান করে লাভ হবে না, একটা হতাশা কাজ করে ওর মধ্যে, এরপর ইতিউতি তাকায়।

-তোমার ছেলে কফি খাচ্ছে, ওর সংগে অলরেডী পরিচয় সেরে ফেলেছি, এরপর বল কেমন আছ?

-আছি মোটামুটি, আপনি?

-আছি, আরকি। তুমি অনেক বদলে গ্যাছো।

-হুমমম, একা এসেছেন, ভাবী নেই? (ফারজানা কথা ঘুরায়)

-তোমার ছেলেকে দেখলাম, সাজ্জাদের ছেলে নাকি ও?

এত সরাসরি প্রশ্নটা মনে হয় আশা করেনি ফারজানা, একটু হকচকিয়ে যায় তবে সামলে নিতে বেশি সময় নেয়না।

-সাজ্জাদ জানে?

দুদিকে মাথা নাড়ায়, যোগাযোগ নেই তো জানবে কিভাবে উত্তর দেয়।

-কেন করলে এরকম?

ফারজানা পূরোটাই বদলে গ্যাছে, এখন অনেক ধীর, উগ্রতা নেই একদম, কথা বলে গুছিয়ে, পোশাক অনেক মার্জিত। উত্তর দেয় অনেক সময় নিয়ে,

-সাজ্জাদ তো আমার কাছে সারাজীবন থাকবে না, আপনিও বুঝেন সেটা, তাই ওকে চুরি করে আনলাম।

আমি কিন্তু এই ফারজানাকে একদমই চিনিনা।

-তোমার হাজবেন্ড?

- সে অনেক কথা, বিয়ের আগেই ফোনে আসিফকে জানিয়েছিলাম, কনসিভ করেছি এইটা ছাড়া সব জানতো, পাশ করার দুইমাসের মধ্যে আমি এখানে চলে আসি, পরের মাসে আসিফ জানতে পারে ঘটনাটা, এরপর সেপারেশন হয়ে যায় আমাদের।

-ভালই খেলেছো তুমি দেখি।

-প্রথম হাফটা খেলেছি অনেক আনন্দে, যেহেতু মাঠে নেমেই পড়েছি, দ্বিতীয় হাফ না খেলে উপায় ছিল না। অনেক কষ্ট হয়েছে, কিন্ত টিকে গেছি।

-এখন কি করছ?

-জীবনটাকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছি, খেলা ছেড়েছি সেই কবে, এখন খেলা শেষের ঘর্মাক্তদেহের দুর্গন্ধ মুছছি।

হঠাত হেসে ফেলে ফারজানা, আবার সেই পুরনো ঝলক দেখি।

-একটা সাদা চামড়া আমেরিকান বেকুবকে বিয়ে করেছি, বেটার বেশ পয়সা, আমিও জব করি। আমেরিকান বেকুব গুলার একটা জিনিস মোটামুটি ভালো, আগের জীবন নিয়ে কোন প্রশ্ন করে না।

এইই আমার চেনা ফারজানা আর তার কন্ঠ।

খুব করে বলেছিল ওদের বাসায় যাবার জন্য। আমি যাইনি, আমার ভয় করছিল, ফারজানার আরও নতুন কোন চমক দেখতে চাইনি।

 

গল্পটা এখানে শেষ হতে পারত। কিন্ত হয়নি।

 

যোবায়ের ভাই এলাকার এমপি হয়েছেন এই খবর পেয়েছি। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের হাওয়ায় চার বছর পরেই যোবায়ের ভাই দেশে চলে আসেন। সাজ্জাদরা যাকে নামানোর জন্য এত কিছু করলো, আর যাকে বাচানোর জন্য যোবায়ের ভাইয়ের এই বেপরোয়া গুলি, গনতন্ত্রের হাওয়ায় তিনি মহা শক্তিশালী তৃ্তীয় পক্ষ হিসেবে আসলেন, যোবায়ের ভাই তার দল থেকে নমিনেশন পেলেন, এবং বিপুল ভোটে জিতলেন। ………।হায়রে রাজনীতি।

 

সবার খবর পাচ্ছিলাম, কিন্তু খবর পাচ্ছিলাম না প্রিয় বন্ধু সাজ্জাদের। তাই ছুটিতে বাংলাদেশে এসে গ্রামে গেলাম, বাবা- মা কেউ বেচে নেই, চৌদ্দ পুরুষ গ্রাম ছেড়েছে, তবুও গ্রামে গেলাম সাজ্জাদকে খুজতে, যদি কেউ বলে দেয় কই আছে সে। যদি মেলে তার দেখা।

 

গ্রামে গেলাম এবং কি আশ্চর্য্য, সাজ্জাদকে পেলাম।

 

সাজ্জাদ এক অল্পবয়সী বিধবাকে বিয়ে করেছে, স্কুলে শিক্ষকতা করে, মজা পুকুরে মাছ চাষ করে, রাস্তা বানায়, জনসচেনতার ক্যাম্প করে, আর নিয়ম করে মসজিদে যায়, পাচ ওয়াক্ত নামাজ পরে জামাতে।

  

    এই সাজ্জাদকে কি এখন ফারজানার কথা বলা যায়, নাকি উচিত, আপনি বলুন?

 

এইসব বাদ দিয়ে আসুন আমরা বরং কিছু কল্পনার রঙ চড়াই।

 

ফারজানা প্রতিভাবান এবং তার সমস্ত মেধা দিয়ে সে গড়ে তুললো লিটল সাজ্জাদকে, কতদুর যেতে পারে লিটল সাজ্জাদ, বারাক ওবামার মত হতে পারে কি? পারে মনে হয়। কি বলেন।

 

আটপৌর শম্পার মেধাবী ছেলে (টিউমারের কথা মনে হয় মনে আছে) যার নাম সাজ্জাদ হলে বেপারটা জমে, মোটামুটি ভাবে জমিয়ে নিল কোন একটা দিকে, ধরুন রাজনীতিতে সবচেয়ে তরুন রাজনীতিক, ধরুন এমপি। অসম্ভব কিছু নেই, হতে পারে।

 

সাজ্জাদের বৈধ ঘরের সন্তান, সাজ্জাদ যেহেতু ঈদানীং সাদা মনের মানুষ, বুদ্ধিমান এবং পরিশ্রমী, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সে নিশ্চয় নিষ্কলুষ নামী দামি কেউ হবেন, রাজনীতিক নন কিন্ত, আর তার সন্তান ভালো কিছু হবে নিশ্চয়।

 

কোন এক জায়গায় এক হয়ে গেল এই তিন জন নতুন প্রজন্মের ধারক, কি হবে তখন? প্রোবাব্লিলিটির জটিল গানিতিক সুত্র কিন্তু দেখা হবার ব্যাপারটা উড়িয়ে দিচ্ছে না।

 

আচ্ছা, এবার আরেকটু রং চড়াই। সব মিলে কতজন ফারজানা, শম্পা আর সাজ্জাদ আছে এইরকম, খুব বেশি নেই, তবে কিছু তো আছেই। মনে করুন এইরকম এক ফারাজানা, শম্পার ছেলের সংগে, এইরকম এক সাজ্জাদের সাদা মনের ছেলের দেখা হল। সুত্র অনুযায়ী সম্ভাবনাটা কিন্ত বাড়ছে।

 

    পৃথিবীটা আসলেই রংগো শালা শেক্সপিয়ার বলেছেন।