পর্ব-সাজ্জাদ
ঠিক সূর্য্য উঠার আগে আগে, যখন মসজিদ থেকে লোকজন নামাজ পরে বের হয়, সেইসময়টায় রাস্তা দিয়ে হাটতে আমার খুব ভালো লাগে। সব কিছু সুনসান, একটা কেমন নিরব পরিবেশ, প্রকৃতিতে আর একটা ব্যস্ত দিনের প্রস্ততি, মাঠের ঘাস গুলো ভেজা ভেজা, পাখির ডাক, আমি বেশ অনুভব করি। দিনের আলো গলে গলে পরে আমার উপর, আমি যান্ত্রিক আর একটা দিনের প্রস্তুতি নেই।
কাল চলে যাব এখান থেকে, অনেক দিন থাকলাম, ৮ বছর তো হবেই, অনেক স্মৃতি, আনন্দ, বেদনা, হাসি কান্না, কুতসিত, বীভতস, কত পরিচিত মুখ, পরিচিত অনুভব, পরিচিত শক্র, পরিচিত পরিবেশ। অবশ্য এতে আমার অনুভুতিতে খুব একটা হাহাকার নেই, আমি ঘসে ঘসে অনেক শক্ত করেছি আমার মাংশপেশি। চলে যাব, যেতে হবে তাই, পিছে পরে থাক হাহাকার, আমার কি?
অনেক ব্যস্ত ছিলাম কালকে রাত অনেকটা পর্যন্ত, গোছগাছ, পুরানো জিনিস ফেলে দেয়া, কিছু পুরান জিনিস উপযুক্ত জায়গায় দিয়ে দেয়া, কিছু নিব ঢাকায় আর কিছু নিব রংপুর, এইসব অনেককিছু।
আর কিছু ছিল ফেলে রাখা হিসাব চুকানো। এসব কাজে জিসানকেই সাধারনত সাথে রাখি, ওর অনেকগুলো গুনের মধ্যে যেটা সবচেয়ে ভালো, কাজের সময় কোন প্রশ্ন না করা। যা বলি চুপচাপ করে যায়। প্রভুভক্ত কুকুরের মত। জিসানের এইগুনটা অবশ্য ধরতে পেরেছি অনেক পরে, যখন অপারেশন গুলোতে ওকে সাথে রাখতে শুরু করি। ওকে কাছে টেনেছি ওর মার দেয়ার ভঙ্গি দেখে, ফার্ষ্ট ইয়ারের একটা ছেলে এমন র্নিবিকার ভাবে কাউকে মারতে পারে, তাও ডাইনিং এর সামান্য ঘটনায় এটা জিসানের আগে কেউ করে দেখায়নি। মারার সময় ওর চেহারা দেখে মনে হচ্ছিল, মার দেয়াটা অনেক উপভোগের একটা কাজ।
আমার শুরুটা অবশ্য এরকম ছিল না। খুব ভালো রেজাল্ট নিয়ে পড়তে এসেছিলাম বাবার আশা পুরনের জন্য, প্রথম বছরটা ভালোই ছিলাম, রেজাল্টটাও ছিল বেশ ভালো। খামোখা আমার রুমটা পুড়িয়ে, মেরে রুমথেকে বের করে না দিলে হয়ত জীবনটা এমন হত না। অই ঘটনার পর পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে বেশ কদিন। আমার আপরাধ, যোবায়ের ভাই আর আমি একই এলাকার ছেলে, যোবায়ের ভাই পার্টি করতেন, গ্রপিং ছিল, আর যেটা করতেন তা হল আমাকে আদর করতেন ছোট ভাইয়ের মত। রুম পুড়ানোর পরের তিন মাসের মধ্যে ছবির মত অনেক কিছু ঘটে গেল, ক্যাম্পাসে ফিরে এলাম বীর দর্পে, যোবায়ের ভাই সহ, সব কিছুর নিয়ন্ত্রন নিয়ে নিলেন যোবায়ের ভাই, আমি পেলাম ভালো পোষ্ট। কোন কিছু না বুঝেই অন্যের কথা আর খবরের কাগজ পড়ে বাবা ভুল বুঝলেন, মাস্তান হয়ে গেছি এই অপবাদ দিয়ে বাবা ত্যাগ করলেন আমাকে। বাসায় যেতে নিষেধ করলেন কারন ছোট ভাইটাও নাকি নষ্ট হবে আমার সাথে মিশে, আর, আর শম্পা ফিরিয়ে দিল ডাইরিটা।
জীবন টা বদলে গেল আমার। যোবায়ের ভাই চলে যাবার পর পুরোটা নিজের করে নিতে খুব একটা কষ্ট হয়নি, গ্রুপে জিসান চলে এসেছে এর মধ্যে।
রেজাল্ট খুব একটা ভালো হয়নি, পাশ করেছি, ভালো হবার কথাও নয় অবশ্য। বরং আমাকে সামনে রেখে রেজাল্ট ভালো করে নিল ফারজানা, মোটামুটি চেহারার মেয়ে, খুব উচ্চকাংখি, ফিজিক্সে পড়ত। আমাদের একটা বোঝাপড়া ছিল, আমার প্রয়োজনে ওকে কাছে পেতাম, সবাই জানতো আমরা প্রেম করি, এই সুবাদে কিছু একাডেমিক সুবিধা নিত সে, আমাকে কিছু করতে হত না, যা করার ফারজানাই করত, কারন ফারজানা তখন ক্যাম্পাসে পরিচিত মুখ, আমার সংগে ঘুরে। ফারজানার প্রয়োজন ফার্ষ্ট ক্লাস, আর আমার প্রয়োজন, মাংসের স্বাদ, আর্তনাদ আর শীতকারে মিলিত অনুচ্চ ধ্বনি, শরীরের রি রি কাপন। অন্য সবার থেকে ফারজানাই কাজটা সবচেয়ে ভালো জানত, তাই ফারজানার প্রথম শ্রেনীতে আমার কোন আপত্তি ছিলনা। আমিতো সুনীল নই, শুধু গন্ধে আমার হয় না, আর তাছাড়া যার গন্ধ নিতে চাইতাম সে সরে গ্যাছে ততদিনে। তাই ফারজানা, গত বছর পাশ করেছে, শুনলাম বিদেশে পি, এইচ, ডি করে এইরকম একজনকে বিয়ে করে এখন আমেরিকায়। আমি খোজ নেইনি, প্রয়োজন নেই, ফারজানাও বুদ্ধিমান মেয়ে, আর যোগাযোগ রাখেনি।
শম্পা বিয়ে করেছে এক কেরানিকে, পাচ হাজার টাকা বেতন। একটা বাচ্চা হয়েছে, বাচ্চাটার পেটে টিউমার, বলেছিলাম দেশের বাইরে নিয়ে যেতে, আমি খরচ দিব, রাজি হল না। অনেক নীতিকথা শুনিয়ে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে। আর নীতিকথা শুনিয়েছেন মা। পাপের টাকায় হাত দিবেন না, মরে যাবেন তবুও। বাবা তো এসব নিয়ে এখন আর ভাবেনই না। শালার জীবন একটা। মাঝে মাঝে ছোট ভাইটা আসে, ভাল করছে বুয়েটে, টুকটাক কথা বলে, আমাকে নিয়ে ওর বুক চেরা দ্বীর্ঘশ্বাস অনুভব করি। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে আমি আমার অচেনা আমিকে খুজি।
আরো এক দু বছর থাকা যেত, কিন্ত ক্যাম্পাস ছাড়ছি প্ল্যান মতই। এলাকার এমপি নুরু ভাইয়ের অবস্থা ভালো না। এবার হারবে নিশ্চিত, তবু তার সংগে কাজ করবো এইবার। সব কিছু একবারে নিয়ে নেবার আগে একটা উপলক্ষ লাগে। উপলক্ষ রেডি হয়েছে। এবার নুরু ভাইয়ের সংগে খুব কাজ করতে হবে, কিন্ত এন্ড অব দ্য ডে ওনাকে ইলেকশনে হারতে হবে। কারন পরের র্টামটা আমার। আর জিসান একটু অর্ধৈয্য হয়ে গেছে দেখি, কিছু দিন পরে কথা আর নাও শুনতে পারে। এখানকার সব কিছু রেডি করে নিয়েছে ওর নিজের জন্য এই খবর আমি পেয়েছি, এখন আমি নিজে থেকে না গেলে সমস্যা হতে পারে।
মিনহাজের কাজটা বাকি থাকল। কালকেও খুজতে বেরিয়েছিলাম জিসানকে নিয়ে, গ্রপ বদল যে সহজ নয় এটা বুঝানো দরকার ওকে। গ্রপ বদলই শুধু না, একমাত্র এল, এম, জিটা নিয়ে বেচে দিয়েছে। প্ল্যান ছিল ওকে ধরে প্রথমে জিসানের হাতে দিব, মনের সুখে পিটানোর জন্য। এরপর, চৌরাস্তার মাথায় নিয়ে পা দুটো ভেংগে দিব যাতে দৌড়াতে না পারে, এরপর সারাগায়ে অকটেন ঢেলে পায়ে একটা গুলি করব। আগুনে পুড়িয়ে মারব ওকে, যাতে এই ভুল করার আগে তিনবার ভাবে অন্যরা। জিসানকে বলেছি প্ল্যানটার কথা, কিন্ত আমি চলে গেলে ও মনে হয় এত কষ্ট করবে না মিনহাজকে শায়েস্তা করতে। এনি ওয়ে, ওর রাজত্ব, ও যেভাবে খুশি চালাক।
শম্পা আর আমার লেখা যে ডাইরিটা ছিল, ওটা কাল রাতে পুড়িয়ে ফেলেছি। প্রায় এগার বছর ডাইরিটা বয়ে বেড়ালাম। আর কত? ডাইরিটা দুমাস থাকত আমার কাছে, পরের দুমাস শম্পার কাছে। সেই আমি যখন ক্লাস টেনে, আর শম্পা এইটে তখন থেকে ওটা লেখা শুরু করি আমরা। আমাদের ঘিরে আমাদের যে অনুভুতি, তার সব আমরা লিখে রেখেছিলাম ওখানে। প্রায় চার বছরের অনুভুতি কালো অক্ষরে লেখা আছে ডাইরির পাতায় পাতায়। আমার এ পথে আসার পর শম্পা ডাইরি নিতে অস্বীকার করে। অথচ কথা ছিল অন্যরকম। কথা ছিল আমরা বিয়ের পর একসংগে ডাইরি পড়বো। আমাদের ছেলে মেয়েদের দেখাবো আমাদের অনুভুতির প্রকাশ। এখন তো আর এগুলো হবে না, কি লাভ বোঝা বাড়িয়ে, আরও অনেক আগেই পুড়িয়ে ফেলা উচিত ছিল ওটা।
কাল চলে যাব এখান থেকে। পরবর্তী দশ বছরের প্ল্যান করা আছে। ক্যাম্পাস থেকে বেরিয়ে প্রথম যাব গুলশানে। একটা ভালো করে ম্যাসাজ নিতে হবে। এরপর অন্যকিছু।
(ফারজানা তাবাসসুম বলছি)
আমার দেখা পৃথিবী সবথেকে কুতসিত কাপল হচ্ছে মিষ্টার হোদল কুঁত কুঁত আর মিসেস ডিম্পল কাপাডিয়া। মিজ কাপাডিয়া কি দেখে যে হোদলটাকে বিয়ে করেছে, এই হিসাব আমি সারা জীবনে মিলাতে পারব বলে মনে হয় না। একসংগে পড়ত এইটা জানি, হোদল খুব মেধাবি, তাও মানি, কিন্তু এই গুলোই কি সব, নাকি তাদের মধ্যে বিয়ের আগেই কোন বোঝাপড়া হয়েছিল। হতে পারে, হলেই ভালো, হিসাব মিলানো সহজ হয়।
হোদলটা আসলেই খুব মেধাবি, বুঝা যায়। যেখানে হাত দিয়েছে, সোনা ফলেছে, বিশেষ করে ব্যবসায়, ১৭/১৮ বছর আগেও, যখন আমার বয়স ছয় কি সাত, আমরা থাকতাম মিরপুর, আর এখন হোদলের গুলশানে একটা ফ্ল্যাট, উত্তরায় সিংগেল ইউনিট বাসা, ধানমন্ডিতে আপার্টমেন্ট, সবার জন্য আলাদা গাড়ি। এর মধ্যে হোদলের গাড়ি দুইটা, একটা জিপ আর একটা কার, কাপাডিয়ার বি এম ডব্লিউ, আর আমার জন্য টয়োটা। এইগুলো আমার জানার মধ্যে, না জানা কি আছে জানি না। হোদলটা মেধা কাজে লাগিয়েছে শুধু মাত্র নিজের উন্নতির জন্য, পয়সা বানানোর ধান্ধায়। তবে মনে হয় না কাপাডিয়ার পয়সা ছাড়া আর কোন চাহিদা আছে হোদলের কাছে।
আর একটা কাজে হোদলটা তার মেধার সর্বচ্চো প্রয়োগ করেছে বলে ধারনা আমার। প্রতি বছর বাংলাদেশের সেরা সুন্দরী একটাকে খুজে বের করে হোদলটা। পারসোনল সেক্রেটারি পোষ্ট নিয়ে কোম্পানিতে জয়েন করে ডানাকাটা এক পরী। দুবছরের কন্ট্রাট থাকে নাকি ওদের। হোদলের মোট সেক্রেটারি তিন জন, এর মধ্যে একজন সবসময় থাকে, বাকি দুজনের মধ্যে প্রতি বছর একজনের চাকুরী বদল হয়, নতুন আর একটা পরী আসে। শীতের শুরুতে হোদলটা নতুন পরীটাকে নিয়ে দেশের বাইরে বিজনেস ট্রিপে যায়। শুনেছি, যে একবার হোদলের সেক্রেটারি হয়েছে, তার সারা জীবন আর কিছু না করলেও চলে।
কাপাডিয়া ব্যাস্ত পার্টি নিয়ে, কোন ক্লান্তি নেই। উরে মারে মা……………।। এত গিলতে পারে এই মহিলা। আর শরীর, মাশাআল্লাহ, মধ্য চল্লিশ, দেখে বুঝার কোন উপায় নাই। আমি যে একটা মেয়ে, পচিশ ছুই ছুই, অই মহিলার পেট থেকে বের হয়েছি, কেউ মানতে চায় না প্রথমে। এখনও মনে পড়ে, আমি যখন প্রথম বুঝতে শিখি ছেলেদের চোখের ভাষা, আমি আর কাপাডিয়া একসংগে বের হলে কেউ বুঝতেই পারত না আমরা মা মেয়ে। একেত আমাদের চেহারার অমিল, কাপাডিয়ার প্রায় কিছুই আমি পাইনি, যত না পেয়েছি হোদল কুঁত কুঁতের, সবাই মায়ের দিকে আড় চোখে তাকাত, অনেক সাহসিরা সরাসরি, আমার দিকে প্রায় কেউই তাকাত না। আমার খুব হিংসে হত তখন কাপাডিয়াকে, পরিচিতরা যখন হাত মেলাত কাপাডিয়ার সংগে, পরিচয় দিত, “প্লিজ মিট উইথ মাই ডটার” বলে, সবাই অবাক হত আমাকে দেখে। প্রথম বুঝতাম না কারনটা, সিন্থিয়া বুঝিয়ে না দিলে হয়ত বুঝতামও না। তবে তাদের অবাক চোখ দেখে কাপাডিয়া যে ভীষন গর্ব অনুভব করত তা বুঝতে পারতাম খুব সহজেই। কাপাডিয়া আর হোদলটা একই বাসায় থাকে, পাশাপাশি রুম, কিন্তু কবে শেষ কথা বলেছে ওরা হাসিমুখে, আমার মনে নেই। কাপাডিয়া বরং অনেক সহজ আংকেলদের সংগে, অনেক আংকেল আছে আমার, ছোট কালে অনেক রকম আদরও করতে চেয়েছিল, এক আংকেলকে তো চড়ই মেরেছিলাম, বুদ্ধিটা অবশ্য সিন্থিয়া দিয়েছিল। খুব মজা হয়েছিল, একদিন কাপাডিয়ার সামনে জানতে চেয়েছিলাম, তার গালের ব্যাথা কমেছে কিনা? কাপাডিয়া তো অবাক, “সেকি রাশেদ ভাই, আপনার গালে ব্যাথা, আমি তো জানলামই না” বকের মত মুখ হয়ে গিয়েছিল ব্যাটার, খুব মজা পেয়েছিলাম, এখনো হাসি পায়।
সিন্থিয়াই একদম কাছের বন্ধু, সেই স্কুলে থাকতে পরিচয়, কত কিছু শিখিয়েছে আমাকে। ওর বাসা আবার ভরা ছবি দিয়ে, কত কালেকশন ছিল ওর। ও অবশ্য বলত ওর ভাইয়ার কথা, ও নাকি মেরে দিয়েছে। যাইহোক, জীবনের সবথেকে চ্যালেঞ্জিং ব্যাপারটা ওই শিখিয়েছে, সবচেয়ে মজা লাগত যখন আমরা নিজেদের মধ্যে প্র্যাকটিস করতাম, নিজেদের ভিডিও নিজেরাই দেখতাম। ওর ভাইয়া, ওর ভাইয়ার বন্ধু, ও আর আমি যেবার কক্সবাজার বেড়াতে গেলাম, সেবারের এক্সপেরিয়েন্স তো তুলোনাবিহীন, এগুলোর ভিডিও রাখতে পারলে দারুন হত, কিন্তু সিন্থিয়াই না করেছিল, ছেলেদের নাকি একদম বিশ্বাস করতে নেই, প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলে ছুড়ে ফেলতে হয়, দেরি হলে ওরাই ছুড়ে ফেলবে।
সাজ্জাদকে মনে হয় ভালবাসতাম, বাসতাম কি? কি জানি? হয়তো হ্যা, কিংবা না! তবে ওর মধ্যে আগুন ছিল। পুড়তে ভাল লাগত। তাছাড়া সিন্থিয়া আমেরিকায় চলে যাওয়াতে অনেক একা লাগত। ক্যাম্পাসে সবাই সাজ্জাদকে কেন যে এড়িয়ে চলত? হতে পারে, ওর তেজী ভাবটা, কিন্তু আমার আবার ওইটাই সবথেকে ভাল লাগত। ওর আগুনে পুড়ে পুড়ে মনে হত আমি সোনা হচ্ছি। ওকে বললে কি আমরা একসংগে থাকতে পারতাম সারাজীবন? কিন্তু সংসার মানেই তো হোদল কুত কুত আর ডিম্পল কাপাডিয়া। আমি না হয় কাপাডিয়া হলাম, কিন্তু সাজ্জাদ তো হোদল চরিত্রে একদম বেমানান। সাজ্জাদকে ভালবাসা যায়, কাছে টানা যায়, সময় কাটানো যায় কিন্তু ওর সংগে অভিনয় করা যায় না।
সাজ্জাদের একটা গোপন ডাইরী ছিল, লুকিয়ে লুকিয়ে কতবার যে পড়েছি ওইটা।, কিশোর বয়সের অনুভুতি এমন হয় নাকি? ইটস লাইক আ হ্যাভেন……… আই কান্ট বিলিভ।
ডাইরী পড়ে আমার, কেন জানি শম্পাকে খুব দেখতে ইচ্ছে হত। ঠিক বললাম কি? না মনে হয়। আমার আসলে শম্পা হতে ইচ্ছে করত।
যোবায়ের-কথন
০০০০০০০
-হ্যালো যোবায়ের সাহেব বলছেন।
-বলুন
-দেখুন, আমি …… বলছি। গত দশদিন ধরে আপনি যেখানে যেখানে যান, ক্যান্টিন, দুলু ভাইয়ের দোকান, হল, হলের ক্যান্টিন, সবখানে আমরা একটা মেসেজ দিয়েছি, আপনি কি এটা পাননি। আপনার হলের প্রভোষ্ট এবং ডিন কেও মেসেজ দেয়া ছিল।
- পেয়েছি, কিন্তু দরকার মনে করিনি, এনিওয়ে, পেয়ে তো গেলেন, এখন বলুন কি চান?
- আপনার সংগে একটু সামনাসামনি কফি খেতে চাই। কালকে আসুন এখানে।
- আমাকে ডিক্টেট করবেন না, আচ্ছা রাখি।
০০০০০০০
-হ্যালো যোবায়ের সাহেব।
-আবার আপনি।
-সাজ্জাদকে বেশি বিশ্বাস করাটা কিন্তু বোকামি হচ্ছে। মিছিলে যাননি, এটা কিন্তু জিসান, মিনহাজ কেউ পছন্দ করেনি। খারাপ অবস্থাতো, কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না।
-অনেক খবর রাখেন দেখি। শুনুন, এরা আমার কাছের লোক, আমাকে না বলে কিছু করেনা।
-রাখতে হয় যোবায়ের সাহেব রাখতে হয়। এত বড় একটা ইস্যু, চোখ তো রাখতে হয়ই, আমরা তো চাকুরি করি। আচ্ছা আপনার বাসায় হাজার দুয়েক টাকা পাঠানো হয়েছে। আপনি তো অনেকদিন যান না, বাসার খবর রাখেন না, একটু টানাটানি হচ্ছিল, টাকাটা পাওয়াতে আপনার মায়ের খুব সুবিধা হয়েছে। আমরা বলেছি আপনি পাঠিয়েছেন, এখন ব্যাস্ত, আসতে পারছেন না, আরও বলেছি, এটা টিউশনি করে কামিয়েছেন। আর কিছু করেনা বললেন, যোবায়ের সাহেব, কালকে রাতের মিটিং কিন্তু আপনাকে ছাড়া হয়েছে, সাজ্জাদ সভাপতিত্ব করেছে। আপনার অনুমতি ছিল কি?
-দেখুন, এসব করে লাভ হবে না। অনুমতি ছিল, আমি পার্টি অফিসে ছিলাম।
-লাভের জন্য করি নাই, আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড জানতে গ্রামে গিয়ে দেখি এই অবস্থা। কষ্ট লাগলো চাচা চাচিকে দেখে। দায়িত্ববোধ থেকে করেছি। আর মিটিং এর কথা বলছেন, আপনার পার্টি অফিসের মিটিং ঠিক হয়ে ছিল চার দিন আগে থেকেই, হঠাত করে এই মিটিংটা ডেকেছে সাজ্জাদ, কারন ও জানে আপনি ওইদিন থাকবেন না। আপনি কিন্তু পিছাতে বলেছিলেন, কাজ কি হয়েছে? জিসান, মিনহাজ ওদেরও তো বলেছিলেন আপনার অসুবিধার কথা। কেউ তো শুনলো না।
- দেখুন, আমার কথা যদি কেউ নাই শুনে তাহলে আপনি আমার পিছনে খামখা সময় কেন নষ্ট করছেন। টাকা পাঠানোর জন্য ধন্যবাদ, এখন রাখি কেমন।
০০০০০০০০০০০
-যাক আসলেন তাহলে। আমি তো আশাই ছেড়ে দিয়েছিলাম।
-আপনার কিছু কিছু তথ্য বিভ্রান্তিকর, তবু আসলাম কারন সাজ্জাদ সর্ম্পকে আপনার অনুমান সঠিক, সে আমাকে সরিয়ে দিতে চাইছে। তবে এখনো সময় আছে, কারন তৃনমূল কর্মিদের সমর্থন, আর পার্টি আমাকেই চিনে, ক্যাম্পাস বলতে আমাকেই বুঝে।
-যাক এতদিন পরে আপনার আর আমার একটা হিসাব মিলল। তো কি খাবেন, চা নাকি কফি। খেতে খেতে কথা বলি।
০০০০০০০০০০০
- সাজ্জাদ কালকের কার্ফু এর সময়কার কি প্ল্যান।
- আগের মতই, সাংস্কৃতিক গোষ্টি গান করবে, পথ নাটিকা আছে, শিক্ষকরা মৌ্ন মিছিল করবে।
- ছাত্রদের মিছিলের কি অবস্থা, ছাত্র হবে তো, ঈদানিং একটু কম কম মনে হয়।
- কি যে বলেন না যোবায়ের ভাই, বরং আপনাকে একটু বিভ্রান্ত লাগে।
- একটু তো টেনশন হয়ই, পুরা কন্সটিটিউশনের এগেইন্সষ্টে তো।
- যোবায়ের ভাই, এইগুলা কি বলেন, সব পার্টির একদাবি, মিডিয়া, ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবি, সংবাদকর্মী, দল, লিগ সব এক কাতারে, আপনি জানেন এইগুলা, কত কষ্ট করে এই জায়গায় আসছি আর আপনি এখন এইগুলা কি বলেন।
- কালকে বক্তব্য কার কার।
- বড় দুই দলের ছাত্র বিশয়ক সম্পাদক আসবেন, ডিনস কমিটির চেয়ারম্যান আর ছাত্রনেতা অই সময় যারা যারা থাকবেন। আর যোবায়ের ভাই, আপনি ঠিক থাকেন, এইটা ছাত্র আন্দোলন, এর গতি ছাত্ররাই ঠিক করবে, আমি আপনার কাছ থেকে সব শিখেছি, আপনি বিভ্রান্ত হলে এই আন্দোলন গতি হারিয়ে ফেলবে।
- আরে না, কি যে বল, গতি হারাবে না, আমি তো মরেও যেতে পারি, তোমরা আছ না।
- যোবায়ের ভাই, আপনি ঠিক থাকেন, এখন অনেকে অনেক কথা বলবে, কিন্তু আমরা আমাদের কাছ করে যাব। ইটস আ ওয়ান ওয়ে রোড, জিততেই হবে।
- হুমম সাজ্জাদ, সিমস আই হেট পলিটিক্স।
- আমরা সবাই তাই, কিন্তু তীর ছোড়া হয়ে গ্যাছে, ফিরার উপায় নাই।
০০০০০০০০০০০
- যোবায়ের ভাই আপনার বক্তৃতা অস্পষ্ট। দিক নির্দেশনা নেই।
- মিনহাজ, আমি আর একটু দেখতে বলেছি, সরকার দাবি বিবেচনা করবে বলছে, আমাদের সময় দেয়া দরকার।
- আপনার কথা বিভ্রান্তিকর। গত মাসে আপনি ছাত্র জমায়েতে আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন। এখন ছাত্রদের বিভ্রান্ত করছেন।
- মিনহাজ তুমি আমার চেয়ে এইসব বেশি বুঝ না নিশ্চয়। আর আমার সামনে চড়া গলায় কথা বলবানা। তোমাদের …… ক্ষমতা আমার জানা আছে।
০০০০০০০০০০
-যোবায়ের সাহেব, আপনি মনে হয় ছাত্রদের উপর আপনার কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলেছেন। আপনার কথা শুনছেনা তারা।
-এভাবে হবে না। শক্তি প্রয়োগ করতে হবে।
-শক্তি প্রয়োগে কিছু হয়না। গত তিন বছর কিছু হয়নি, রেকর্ড তাই বলে।
-এবার হবে, আমি থাকব।
- আপনি কি বলতে চান স্পেসিফিক্যালি বলুন।
————————————————-
- আপনার মাথা খারাপ হয়ে গ্যাছে যোবায়ের সাহেব। একটু বসুন, চা বা কফি দিতে বলি। নিচে গাড়ি আছে, বলে দিচ্ছি, যেখানে নামতে চান নামিয়ে দেবে।
- এইটাই একমাত্র রাস্তা।
- রাস্তা নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। আপনি চা খান, একটু ঢাকার বাইরে থেকে ঘুরে আসুন। আমরা তিনদিন পরে আবার কথা বলি। ও আর হ্যা, কেউ কি নেই আপনার সংগে।
- আছে কয়েকজন, মধ্যম সারির, বিভিন্ন হলে থাকে।
- অসুবিধা নাই, নেক্সট জমায়েতের আগে কিছু একটা প্ল্যান করে ফেলব, আপনি যান, বিশ্রাম করুন।
০০০০০০০০০০০
-স্যার, কত কিছুদিন থেকে একজন লোক ফ্ল্যাটের আশপাশে ঘুর ঘুর করে, আপনাকে খুজে।
-আমাকে খুজে এইটা বুঝছিস কিভাবে?
-স্যার আপনার নাম কইছে? কইছে সাজ্জাদ সাহেব এইখানে আসেন কিনা?
-তাই নাকি, তারপর।
-আমি কইছি, মাঝে মাঝে আসে, আপনারে দেওয়ার জন্য চিঠি দিছে একটা।
-দেখি চিঠি দে, বেকুব কোথাকার।
০০০০০০০০০০০০
-অনেক দিন পরে তাই না সাজ্জাদ।
-যোবায়ের ভাই, কেন খুজছেন বলেন।
-ঘৃনা হচ্ছে নাকি আমাকে?
-স্বাভাবিক, আমি এসেছি কারন আমি আপনার মত বেঈমান নই, আমার এই অবস্থানের পিছনে আপনার আবদান আমি ভুলিনি।
-শুনে খুব ভালো লাগল। ভাবছিলাম তুমি কি ভাবে নিবে?
-সব শালা কি আর মিরজাফর হয় যোবায়ের ভাই, এনিওয়ে কেমন আছেন?
-আর থাকা, জানই তো।
-কি চাচ্ছেন বলুন এবার।
-তুমি খুব শার্প সাজ্জাদ, আমাকে দেশের বাইরে যাবার একটা ব্যাবস্থা করে দাও।
-দুমাস পরে এইখানে আসবেন। সব রেডি থাকবে। তবে একটা শর্ত আছে।
-অসুবিধা নাই, আগামি তিন বছর আমি দেশে আসব না।
-তিন না, যোবায়ের ভাই, আগামি দশ বছর, আপনি দুই টার্ম পরে আসবেন।
-ঠিক আছে, তুমি বাড়ির খোজ খবর রাখিও।
-আর একটা প্রশ্ন
-বল
-মিছিলে এলোপাতাড়ি গুলি করলেন ক্যানো? তাও আবার দাংগা পুলিশ নিয়ে?
-কেউ কিন্তু মারা যায়নি।
-যেতে পারত।
-সাজ্জাদ, মানুষ ভুল করে, কারন সে মানুষ, আমি আসব দুইমাস পরে, বেচে আছি যেহেতু, দেখা হবে নিশ্চয়।
-আপনার সংগে দেখা করতে চাই না। অন্য কেউ আসবে, আপনার কাজ হয়ে যাবে।
(লেখকের টুকিটাকি কথা)
সচেতন পাঠক হিসেবে তো বটেই, এই সিরিজে লেখক হিসেবেও আমি মনে করি, এইখানে সিরিজ শেষ করাটা ঠিক হচ্ছে না। আরও কয়েকটা পর্ব আসা উচিত। শম্পার কথা যদি নাও গুনি, তবুও মিনহাজ আর জিসান কে নিয়ে অন্ততঃ আরও দুটো পর্ব আসলে ব্যাপারটা একটা কিছু হলেও দাড়াতে পারত।
উলটো পিঠের যুক্তিও আছে, একেবারে ফেলনা না সেগুলোও। সিরিজের নাম নব্বইয়ের হ্যামলেট, অর্থটা পরিষ্কার, নব্বই দশকের এমন কিছু চরিত্র, যারা নিজেকে বার বার খুজছে বা বদলাচ্ছে। সিদ্ধান্তহীনতার আক্ষেপ, সিদ্ধান্ত নিতে না পারার হতাশা, ভুল সিদ্ধান্তের জন্য অনুশোচনা, বা সিদ্ধান্ত বদলানো এবং এর পিছনের কারন হিসেবে নিজের মনকে বুঝানো এইসব ফুটিয়ে তোলা। মিনহাজ, জিসান শম্পারা এই দলে ঠিক পরে না। কারন এরা সহজে সিদ্ধান্ত বদলায়নি, অন্ততঃ আমার জানা মতে। আর দ্বিতীয় কারনটা, শম্পা ছাড়া বাকি দুজনের সংগে আমার তেমন ভালো চেনাজানা নেই, তাই তাদের মানসিকতার ব্যাপারটা আমি ফুটিয়ে তুলতে চাইলে, হয়ত, ভুল জিনিস উঠে আসত। ভুলটা এড়াতে চাইলাম। তবে মিনহাজ, জিসানকে নিয়ে নষ্ট প্রজন্ম বা এইরকম কিছু নাম দিয়ে কিছু একটা লেখার চিন্তাটা মাথায় রাখলাম।
আমার পরিচয়টা এই ফাকে দিয়ে নেই, পাঠক বুঝতে পারবেন আমি কিভাবে জড়ালাম নিজেকে। সাজ্জাদ আর আমি ছেলেবেলার বন্ধু। একই স্কুলে পড়তাম, আমার এবং সাজ্জাদের বাবা সেই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। ভাল ছেলে বলতে যা বুঝায় আমরা ছিলাম তাই। প্রথম এবং দ্বিতীয় স্থান আমাদের জন্য নির্ধারিতই ছিল একরকম, অন্যরা পরীক্ষা দিত তার পরের স্থান গুলোর জন্য। এইসব ভালোছেলে টাইপ গুনাবলী দিয়ে ভর্তি ছিলাম আমরা, যেমন থাকে আরকি ভালোছেলেদের, কথা ওদিকে না গেলেই মনে হয় ভালো হবে।
বায়োকেমিষ্ট্রি ছিল আমার সাবজেক্ট, সাজ্জাদের আ্যপ্লাইড ফিজিক্স, ওর রুমে আমিও ছিলাম, যোবায়ের ভাই আমাকেও খুব আদর করতেন, হল থেকে আমিও বিতারিত হয়েছিলাম এই অপরাধে, ইউনিতে মিল বলতে ছিল এইগুলা। আর একটা মিল ছিল, আমরা ওইখানেও খুব ভালো বন্ধুও ছিলাম।
বাকি সব অমিল আর অমিল।
প্রথম অমিল শুরু হয় ঘটনার মুল্যায়ন দিয়ে, সাজ্জাদ প্রতিবাদী হয়ে উঠে, আর আমি আরও ভালো ছেলে হয়ে উঠি। ওর রেজাল্ট খারাপ হতে থাকে, আর আমার ভালো থেকে ভালো হতে থাকে। সাজ্জাদের পরিচিত বাড়তে থাকে, আর আমি পরিচিতি পাই গুটি কয়েকজনের কাছে, অন্যরা আমাকে আতেল নামে ডাকে। সাজ্জাদের লাইফ ষ্টাইল অনেকের কাছে অনুকরনীয় হয়ে পরে, রোল মডেলের মত, আর আমি, ঘরকুনো ইদুর কিংবা তেলাপোকার জীবন (সাজ্জাদের ভাষায়), ক্লাস, ক্যান্টিন, হল, লাইব্রেরী এই…
’৯০ এর পট পরিবর্তন সাজ্জাদকে আরও বেপরোয়া করে তোলে, প্রমোশনের জন্য শিক্ষকরা তার কাছে তদবীর নিয়ে যায়, ভাইস চ্যান্সেলর হবার জন্য একজন ডিনের সংগে সাজ্জাদের মিটিং ক্যাম্পাসে তোলপাড় তোলে। আমি তখন মাষ্টার্স নিয়ে খুব ব্যস্ত।
মাষ্টার্স এর পর স্বাভাবিক ভাবেই, ভালো চাকুরি, GRE, বাইরে পড়তে যাওয়া, বাইরে নিজেকে তৈরী করা, বাবার মৃত্যু, আরও অনেক কিছু নিয়ে বেশ ব্যস্ত। অনেকদিন পড়ে যখন মনে হবার মত করে মনে হল প্রিয় বন্ধুটির কথা তখন আমি বেশ প্রতিষ্ঠিত, তরুন গবেষক হিসেবে কিছু নাম ডাক, সেমিনার গুলোয় ডাক পরে, ওদের খরচে নিয়ে যায় এখানে ওখানে। জীবন সহজ থেকে সহজ হতে থাকে।
জাকসন হাইটে মাঝে মাঝে বাংগালী আড্ডায় যাই, অন্য কিছু না এমনি বেড়ানো। সেইখানে হঠাত একদিন দেখি আমার বন্ধু সেই ছোটবেলার সাজ্জাদ ঘুরে বেড়াচ্ছে।
আমি আক্ষরিক অর্থেই অবাক হয়ে যাই, সাজ্জাদ এখানে, এত কম বয়স!!, ঠিক যেন আমার ১২ বছরের বন্ধুটি ব্লু জিন্স আর টি শার্ট পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি তাকে ডাকি কথা বলার জন্য। তার সংগে কথা বার্তা আমেরিকান ইংলিশে যা হল তা মোটামুটি এইরকমঃ
-হাই
-ও, হাই,
-আমি কি তোমার সংগে একটু কথা বলতে পারি।
-নিশ্চয়ই।
-তোমার গেটাপ খুব সুন্দর, তুমি কোথায় থাক?
(১২ বছরের সাজ্জাদ বলে কোথায় থাকে ও)
- কিছু মনে কর না, তুমি কি ইন্ডিয়ান?
- না আমি বাই বর্ন আমেরিকান, কিন্ত মা বাংলাদেশী।
- বাবা? (আমি কি একটু উত্তেজিত)
- আমি এখন ষ্টেপ বাবার সংগে থাকি, উনি আমেরিকান।
- তুমি কি প্রায়ই আস এখানে?
- প্রায় না, মাঝে মাঝে আসি, তবে মা আসেন প্রায়ই।
- আমার খুব ভালো লাগত যদি তোমার মায়ের সংগে পরিচিত হতে পারতাম।
- ওই তো মা, শপিং করছে, যাও না কথা বল, আমি ডেকে আনব?
আমি দেখি, যদিও বেশ খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে, অনেক দিন আগে শেষ দেখেছি, কিন্ত ফারজানাকে চেনা যায়।
লেখকদের নাকি ঘৃনা থাকতে নেই, কিন্ত ফারজানাকে যখন প্রথম দেখি, তখন থেকে ওর জন্য আমার হূদয়ে ঘৃ্না ছাড়া আর কিছু নেই, আর এখন ফারজানাকে দেখে সেটা গলা পর্যন্ত পাকিয়ে আসে, আমার বমি বমি ভাব আসে, বাতাস হারিয়ে যায়, মাথাটা বনন করে ঘুরে উঠে। আমার উচিত এখান থেকে দ্রুত কেটে পড়া, এবং জাকসন হাইটে আর না আসা।
কিন্তু ষ্টুপিড পা আমার কথা শুনে না, একমিনিট পড়ে আমি দেখি আমি ফারজানার পিছনে দাঁড়িয়ে ওকে ডাকছি।
ফারজানার মুখের দিকে তাকিয়ে খুব অল্প সময়ের মাঝেই আমি অনেক গুলো পরিবর্তন দেখতে পাই, প্রথমে কাউকে চিনতে না পারা, এরপর একটু একটু করে চিনতে পারা, এরপর পুরোপুরি চিনে ফেলার আনন্দ এরপর নিজেকে লুকিয়ে রাখার আপ্রান চেষ্টা করে ফারজানা, অল্প পরেই বুঝতে পারে না চেনার ভান করে লাভ হবে না, একটা হতাশা কাজ করে ওর মধ্যে, এরপর ইতিউতি তাকায়।
-তোমার ছেলে কফি খাচ্ছে, ওর সংগে অলরেডী পরিচয় সেরে ফেলেছি, এরপর বল কেমন আছ?
-আছি মোটামুটি, আপনি?
-আছি, আরকি। তুমি অনেক বদলে গ্যাছো।
-হুমমম, একা এসেছেন, ভাবী নেই? (ফারজানা কথা ঘুরায়)
-তোমার ছেলেকে দেখলাম, সাজ্জাদের ছেলে নাকি ও?
এত সরাসরি প্রশ্নটা মনে হয় আশা করেনি ফারজানা, একটু হকচকিয়ে যায় তবে সামলে নিতে বেশি সময় নেয়না।
-সাজ্জাদ জানে?
দুদিকে মাথা নাড়ায়, “যোগাযোগ নেই তো জানবে কিভাবে” উত্তর দেয়।
-কেন করলে এরকম?
ফারজানা পূরোটাই বদলে গ্যাছে, এখন অনেক ধীর, উগ্রতা নেই একদম, কথা বলে গুছিয়ে, পোশাক অনেক মার্জিত। উত্তর দেয় অনেক সময় নিয়ে,
-সাজ্জাদ তো আমার কাছে সারাজীবন থাকবে না, আপনিও বুঝেন সেটা, তাই ওকে চুরি করে আনলাম।
আমি কিন্তু এই ফারজানাকে একদমই চিনিনা।
-তোমার হাজবেন্ড?
- সে অনেক কথা, বিয়ের আগেই ফোনে আসিফকে জানিয়েছিলাম, কনসিভ করেছি এইটা ছাড়া সব জানতো, পাশ করার দুইমাসের মধ্যে আমি এখানে চলে আসি, পরের মাসে আসিফ জানতে পারে ঘটনাটা, এরপর সেপারেশন হয়ে যায় আমাদের।
-ভালই খেলেছো তুমি দেখি।
-প্রথম হাফটা খেলেছি অনেক আনন্দে, যেহেতু মাঠে নেমেই পড়েছি, দ্বিতীয় হাফ না খেলে উপায় ছিল না। অনেক কষ্ট হয়েছে, কিন্ত টিকে গেছি।
-এখন কি করছ?
-জীবনটাকে বয়ে নিয়ে যাচ্ছি, খেলা ছেড়েছি সেই কবে, এখন খেলা শেষের ঘর্মাক্তদেহের দুর্গন্ধ মুছছি।
হঠাত হেসে ফেলে ফারজানা, আবার সেই পুরনো ঝলক দেখি।
-একটা সাদা চামড়া আমেরিকান বেকুবকে বিয়ে করেছি, বেটার বেশ পয়সা, আমিও জব করি। আমেরিকান বেকুব গুলার একটা জিনিস মোটামুটি ভালো, আগের জীবন নিয়ে কোন প্রশ্ন করে না।
এইই আমার চেনা ফারজানা আর তার কন্ঠ।
খুব করে বলেছিল ওদের বাসায় যাবার জন্য। আমি যাইনি, আমার ভয় করছিল, ফারজানার আরও নতুন কোন চমক দেখতে চাইনি।
গল্পটা এখানে শেষ হতে পারত। কিন্ত হয়নি।
যোবায়ের ভাই এলাকার এমপি হয়েছেন এই খবর পেয়েছি। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের হাওয়ায় চার বছর পরেই যোবায়ের ভাই দেশে চলে আসেন। সাজ্জাদরা যাকে নামানোর জন্য এত কিছু করলো, আর যাকে বাচানোর জন্য যোবায়ের ভাইয়ের এই বেপরোয়া গুলি, গনতন্ত্রের হাওয়ায় তিনি মহা শক্তিশালী তৃ্তীয় পক্ষ হিসেবে আসলেন, যোবায়ের ভাই তার দল থেকে নমিনেশন পেলেন, এবং বিপুল ভোটে জিতলেন। ………।হায়রে রাজনীতি।
সবার খবর পাচ্ছিলাম, কিন্তু খবর পাচ্ছিলাম না প্রিয় বন্ধু সাজ্জাদের। তাই ছুটিতে বাংলাদেশে এসে গ্রামে গেলাম, বাবা- মা কেউ বেচে নেই, চৌদ্দ পুরুষ গ্রাম ছেড়েছে, তবুও গ্রামে গেলাম সাজ্জাদকে খুজতে, যদি কেউ বলে দেয় কই আছে সে। যদি মেলে তার দেখা।
গ্রামে গেলাম এবং কি আশ্চর্য্য, সাজ্জাদকে পেলাম।
সাজ্জাদ এক অল্পবয়সী বিধবাকে বিয়ে করেছে, স্কুলে শিক্ষকতা করে, মজা পুকুরে মাছ চাষ করে, রাস্তা বানায়, জনসচেনতার ক্যাম্প করে, আর নিয়ম করে মসজিদে যায়, পাচ ওয়াক্ত নামাজ পরে জামাতে।
এই সাজ্জাদকে কি এখন ফারজানার কথা বলা যায়, নাকি উচিত, আপনি বলুন?
এইসব বাদ দিয়ে আসুন আমরা বরং কিছু কল্পনার রঙ চড়াই।
ফারজানা প্রতিভাবান এবং তার সমস্ত মেধা দিয়ে সে গড়ে তুললো লিটল সাজ্জাদকে, কতদুর যেতে পারে লিটল সাজ্জাদ, বারাক ওবামার মত হতে পারে কি? পারে মনে হয়। কি বলেন।
আটপৌর শম্পার মেধাবী ছেলে (টিউমারের কথা মনে হয় মনে আছে) যার নাম সাজ্জাদ হলে বেপারটা জমে, মোটামুটি ভাবে জমিয়ে নিল কোন একটা দিকে, ধরুন রাজনীতিতে সবচেয়ে তরুন রাজনীতিক, ধরুন এমপি। অসম্ভব কিছু নেই, হতে পারে।
সাজ্জাদের বৈধ ঘরের সন্তান, সাজ্জাদ যেহেতু ঈদানীং সাদা মনের মানুষ, বুদ্ধিমান এবং পরিশ্রমী, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সে নিশ্চয় নিষ্কলুষ নামী দামি কেউ হবেন, রাজনীতিক নন কিন্ত, আর তার সন্তান ভালো কিছু হবে নিশ্চয়।
কোন এক জায়গায় এক হয়ে গেল এই তিন জন নতুন প্রজন্মের ধারক, কি হবে তখন? প্রোবাব্লিলিটির জটিল গানিতিক সুত্র কিন্তু দেখা হবার ব্যাপারটা উড়িয়ে দিচ্ছে না।
আচ্ছা, এবার আরেকটু রং চড়াই। সব মিলে কতজন ফারজানা, শম্পা আর সাজ্জাদ আছে এইরকম, খুব বেশি নেই, তবে কিছু তো আছেই। মনে করুন এইরকম এক ফারাজানা, শম্পার ছেলের সংগে, এইরকম এক সাজ্জাদের সাদা মনের ছেলের দেখা হল। সুত্র অনুযায়ী সম্ভাবনাটা কিন্ত বাড়ছে।
“পৃথিবীটা আসলেই রংগো শালা” শেক্সপিয়ার বলেছেন।